যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বাণিজ্য নীতি দেশটির নিজস্ব অটোমোবাইল শিল্পের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কানাডায় মার্কিন তৈরি গাড়ির বিক্রির হার নতুন করে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কনীতির এক নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জেডি পাওয়ার কানাডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কানাডায় নতুন গাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে মার্কিন তৈরি গাড়ির অংশ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮.৪ শতাংশ। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে এই হার ছিল ৩৫.৪ শতাংশ। আরও পেছনে তাকালে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে কানাডার বাজারে মার্কিন গাড়ির গড় অংশ ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। এক দশক আগেও কানাডার রাস্তায় চলাচলের প্রায় অর্ধেক নতুন গাড়িই ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত।
বিশ্লেষকদের মতে, গত দেড় বছরে কানাডার ওপর আরোপিত ধারাবাহিক আমদানি শুল্ক এই পতনের মূল কারণ। এর মধ্যে কানাডিয়ান তৈরি গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক অন্তর্ভুক্ত ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই শুল্কের পরিমাণ দ্বিগুণ হবে এবং এটি গাড়ি alongside অটো পার্টস ও স্টিলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এর জবাবে কানাডাও পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে এবং মার্কিন তৈরি গাড়ি ও অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করেছে।
রয়্যাল ব্যাংক অফ কানাডার (RBC) একটি বিশ্লেষণ বলছে, মার্কিন অটো শিল্পের জন্য কানাডা সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, যা পরবর্তী ১০টি বাজারের সম্মিলিত আয়তনের চেয়েও বড়। চলতি বছরে দুই দেশের মধ্যে অটো বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে বর্তমান শুল্কনীতি এই দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কানাডিয়ান ভেহিকল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিইও ব্রায়ান কিংস্টনের মতে, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং মূল্য—প্রতিটি সূচকই প্রমাণ করছে যে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি তার নিজস্ব অটো শিল্পকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা। বর্তমান যুগে কোনো গাড়িই এককভাবে একটি দেশে তৈরি হয় না; হাজার হাজার যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয় যা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কারখানায় তৈরি হয়। ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলো নিজেদের গাড়ির জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল। জিএম (GM) এবং স্টেলান্টিস-এর মতো কোম্পানিগুলো শুল্কের কারণে বিলিয়ন ডলার ক্ষতির কথা জানিয়েছে। কেলী ব্লু বুক-এর হিসাব অনুযায়ী, এই শুল্কের ফলে গাড়ির দাম ৬,০০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা পরোক্ষভাবে ট্যাক্স, ফিন্যান্সিং এবং বিমার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, এই বিধিনিষেধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ির উৎপাদন কমে যাবে, কারণ অনেক 'আমেরিকান-মেড' গাড়ি চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হওয়ার আগে কানাডা বা মেক্সিকোতে সংযোজন করা হয়। এর ফলে শ্রমিকের চাহিদা কমেছে; ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে প্রায় ৭৫,০০০ কর্মসংস্থান হারিয়েছে, যার মধ্যে মোটরযান ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন খাতের লোকসান প্রায় ২৫,৯০০টি। যদিও টয়োটার ৩.৬ বিলিয়ন ডলারের সান আন্তোনিও প্ল্যান্ট বা ফোর্ডের কিছু উৎপাদন চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
এদিকে মার্কিন কোম্পানিগুলোর এই পতনের সুযোগ নিচ্ছে এশিয়া ও ইউরোপের প্রতিযোগীরা। তাদের সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে উৎপাদন খরচ কম এবং শুল্কের চাপও কম। জেডি পাওয়ার-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে জাপানি আমদানির হার ছিল ১৩.৭%, যা চলতি বছরের একই সময়ে বেড়ে ১৬.৬% হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার আমদানির হারও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫.৬ শতাংশে। ব্রায়ান কিংস্টনের মতে, বর্তমান শুল্ক খরচের কারণে উত্তর আমেরিকায় গাড়ি তৈরির চেয়ে জাপান, জার্মানি বা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে গাড়ি আনা এখন বেশি সাশ্রয়ী, যা উত্তর আমেরিকার অটোমোবাইল শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য আশঙ্কাজনক।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার এই বাণিজ্যিক টানাপোড়েন দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। ১৯৬৫ সালের চুক্তি, ১৯৯৪ সালের নাফটা (NAFTA) এবং ২০২০ সালের ইউএসএমসিএ (USMCA) চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়েছিল। তবে ট্রাম্প ইউএসএমসিএ চুক্তি নবায়ন করতে অস্বীকার করেছেন। ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের মতে, এই চুক্তির অব্যাহতি বাতিল হলে আগামী দশকে ৪৬৬ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত কর বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯৫,০০০ পূর্ণকালীন কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই করবে না, বরং গত ৬০ বছরের শিল্প সমন্বয় ও বন্ধুত্বের সম্পর্ককেও ঝুঁকির মুখে ফেলবে।




