ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার চাপালী গ্রামে বসবাস করেন ওয়াহেদ আলী শেখ (৫২)। তিনি প্রয়াত আনসার আলী শেখের জ্যেষ্ঠ পুত্র; চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনিই সবার বড়। তাঁর হাতে এখন একটি বিশেষ দ্বিচক্রযান—যা কেবল একটি যানবাহন নয়, বরং তিনটি প্রজন্মের স্মৃতি, স্নেহ ও পরিচর্যার জীবন্ত প্রতীক। ১৯৪৬ সালে যশোর শহর থেকে মাত্র তিন টাকা দিয়ে এই ইংল্যান্ডের র‍্যালি ব্র্যান্ডের সাইকেলটি কিনেছিলেন ওয়াহেদ আলীর প্রপিতামহের ভাই ইউসুফ আলী শেখ। তখন তিনি তহশিল কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন এবং কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্যই এটি ব্যবহার করতেন।

সময়ের প্রবাহে এই দ্বিচক্রযানটি নানা হাত ঘুরে আজ ওয়াহেদ আলীর কাছে পৌঁছেছে। ইউসুফ আলী ও পাচু শেখ ছিলেন দুই সহোদর। পাচু শেখের তিন পুত্রের মধ্যে আনসার আলী শেখ ছিলেন ওয়াহেদ আলীর পিতা। ওয়াহেদ আলী জানান, তাঁর পিতা প্রয়াত আনসার আলী শেখের কাছ থেকেই তিনি সাইকেলটির ইতিহাস শুনেছেন। সাইকেলটি কেনার প্রায় আট-নয় বছর পর ইউসুফ আলী অসুস্থ হয়ে পড়লে যানটি তাঁর বাড়িতেই ছিল। তিনি তাঁর ভাইঝি জাহারন নেছার প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন এবং একদিন তাকে এই সাইকেলটি উপহার দেন। তবে জাহারন নেছা দ্বিচক্রযান চালানোর দক্ষতা রাখতেন না। ফলে তাঁর ভাই আনসার আলী সেটি নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন।

আনসার আলী শেখ পেশায় ছিলেন একজন সাইকেল মেরামতের কারিগর। কালীগঞ্জ শহরের ভূষণ স্কুল সড়কে তাঁর একটি দোকান ছিল, পরে তিনি গান্না সড়কেও দোকান খোলেন। দীর্ঘদিন তিনি বাড়ি থেকে দোকানে যাতায়াত করেছেন এই একই সাইকেল দিয়ে। যানটির প্রতি তাঁর যত্ন ছিল অপরিসীম। সামান্য কোনো ত্রুটি দেখা দিলেই তিনি নিজ হাতে তা মেরামত করতেন। প্রয়োজনে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা হলেও এর মূল কাঠামো আজও অপরিবর্তিত রয়েছে।

পিতার মৃত্যুর পর সাইকেলটি জ্যেষ্ঠ পুত্র ওয়াহেদ আলীর হাতে আসে। ওয়াহেদ আলী পেশায় সাইকেল মিস্ত্রি নন, তবুও পিতার মতোই যত্নসহকারে তিনি এটি ব্যবহার করেন। জরুরি প্রয়োজনে এখনো তিনি এই দ্বিচক্রযানেই ছুটে যান; সামান্য দূরত্ব অতিক্রমের ক্ষেত্রেও এটি তাঁর নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। ওয়াহেদ আলী বলেন, তিনি পিতার হাত থেকেই এই সাইকেলটি পেয়েছেন এবং যত্ন করে ব্যবহার করছেন। তাঁর আশা, আরও বহু বছর তিনি এটি ব্যবহার করতে পারবেন। সম্প্রতি চাপালী গ্রামে দ্বিচক্রযানের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি এর দীর্ঘ যাত্রার কথা বর্ণনা করেন।

ওয়াহেদ আলীর ভাই আবদুস সামাদ জানান, তাঁদের পিতা আনসার আলী কেবল যাতায়াতের জন্যই নয়, বিভিন্ন পণ্য বহনের কাজেও এই সাইকেলটি ব্যবহার করতেন। এলাকার অনেকেই প্রয়োজনে তাঁর পিতার কাছ থেকে এটি ধার করে নিয়ে যেতেন এবং কাজ শেষ হলে আবার ফিরিয়ে দিতেন। আবদুস সামাদ আরও বলেন, তাঁদের পিতা সাইকেলটিকে অত্যন্ত যত্ন করে রাখতেন। বর্তমানে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভাইও একইভাবে পরিচর্যা করেন। তিনি যোগ করেন, সাইকেলটি দেখলে কেউ অনুমান করতে পারে না যে এটি এত প্রাচীন। এখনো ওয়াহেদ আলীর পাশাপাশি অন্য ভাইয়েরাও জরুরি প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করেন।

চাপালী গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা গোলাম সরোয়ার (৭৫) ছোটবেলা থেকেই আনসার আলী শেখকে এই সাইকেল চালিয়ে চলাফেরা করতে দেখেছেন। আট দশক পেরিয়েও যানটি সচল থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি সহজ ভাষায় বলেন, কোনো বস্তুর প্রতি ভালোবাসা ও নিয়মিত পরিচর্যা থাকলে সেটি দীর্ঘকাল ব্যবহার করা সম্ভব। তাঁর মতে, এই দ্বিচক্রযানের দীর্ঘায়ুই তার প্রমাণ।

তিন টাকা দামের সেই সাইকেল আজ আর কেবল একটি প্রাচীন যানবাহন নয়। ইউসুফ আলী শেখ থেকে আনসার আলী শেখ এবং সেখান থেকে ওয়াহেদ আলী শেখ—এই তিন প্রজন্মের হাতে এটি একটি পরিবারের স্মৃতি, স্নেহ ও যত্নের অমলিন প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।