যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ম্যাথিউ কিলিংসওয়ার্থ পরিচালিত একটি বিশ্লেষণে অংশ নেন ৩৩ হাজার ৩৯১ জন কর্মজীবী প্রাপ্তবয়স্ক। তাঁদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় প্রায় ১৭ লাখ ২৬ হাজার মুহূর্তভিত্তিক অনুভূতির তথ্য। এই তথ্যভাণ্ডার পর্যালোচনায় দেখা যায়, উপার্জন বৃদ্ধি পেলে মানুষের দৈনন্দিন স্বস্তি ও জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি উভয়ই ধীরে ধীরে বাড়ে। পূর্বে প্রচলিত ধারণা ছিল যে নির্দিষ্ট আয়ের সীমা পার হলে সুখ স্থির হয়ে যায়, কিন্তু এই গবেষণায় তেমন কোনো স্পষ্ট সীমারেখা চিহ্নিত হয়নি।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যম বার্ষিক পারিবারিক আয় ছিল ৮৫ হাজার মার্কিন ডলার। তবে গবেষকরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এটি কোনো জাদুকরী সীমা নয়। এমন নয় যে এর চেয়ে কম আয়ে মানুষ অসুখী বা এর বেশি হলেই সুখ নিশ্চিত। অংশগ্রহণকারীদের আয়ের পরিসর ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত, আর আয় ও ভালো থাকার সম্পর্কটি ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়েছে।

সুখের জন্য ঠিক কত টাকা প্রয়োজন—এই প্রশ্নের একক জবাব নেই। ঢাকায় বসবাসকারী একটি পরিবারের চাহিদা ও নিউইয়র্কে থাকা পরিবারের প্রয়োজন এক নয়। একজনের জন্য যা স্বস্তির উৎস, অন্যজনের জন্য তা হয়তো শুধু মৌলিক চাহিদা মেটাতেই ব্যয় হয়। তাই শুধু টাকার অঙ্ক দিয়ে সুখের পরিমাপ করা যায় না; জীবনযাপনের খরচ, পারিবারিক দায়িত্ব, ঋণের বোঝা, স্বাস্থ্য, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সম্পর্ক—সবই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে ২০২৩ সালে পেনসিলভানিয়া ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ বিশ্লেষণে। সেখানে গড়ে আয় বৃদ্ধি ও সুখ বৃদ্ধির সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেলেও, তুলনামূলকভাবে যারা আগে থেকেই বেশি অসুখী ছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট স্তরের পর আয়ের প্রভাব কমে যেতে পারে—কখনো কখনো তা স্থিরও হতে পারে। অর্থাৎ টাকা ও সুখের সম্পর্ক ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন।

২০২৬ সালে প্রকাশিত পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি বিশ্লেষণে আরও একটি দিক উঠে আসে। সাধারণভাবে উচ্চ আয়ের মানুষ বেশি সুখী হন, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে কাটানো সময়ে সেই পার্থক্য সবসময় একইভাবে প্রতিফলিত হয় না। তাই ভালো বেতন মানেই প্রতিদিন সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার আনন্দ—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।

টাকা দিয়ে সত্যিকারের বন্ধুত্ব, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক, ভালোবাসা কিংবা স্বাস্থ্য কেনা সম্ভব নয়। প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো সময়ও বাজার থেকে কেনা যায় না। কিন্তু আর্থিক নিরাপত্তা মানুষের দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। মাসের শেষ সপ্তাহে ব্যাংকে পর্যাপ্ত টাকা থাকলে, সন্তানের হঠাৎ চিকিৎসার খরচ মেটাতে হলে, বাসার ভাড়া নিয়ে প্রতিদিন হিসাব করতে না হলে—এই স্বস্তি সরাসরি সুখ কিনে না দিলেও, অনিশ্চয়তার বোঝা হালকা করে।

আর্থিক সুরক্ষা মানুষকে নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি দেয়। কোথায় থাকবেন, কী খাবেন, সন্তানকে কোথায় পড়াবেন—এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার স্বাধীনতা বাড়ে। তাই টাকা অনেক সময় আনন্দের চেয়ে বেশি কিনে দেয় নিরাপত্তা ও বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ। চিকিৎসার ব্যয় মেটানো, নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা, সন্তানকে শিক্ষার সুযোগ দেওয়া, জরুরি মুহূর্তে বিকল্প তৈরি করা—এসব ক্ষেত্রে অর্থের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এমনকি অপছন্দের চাকরি ছেড়ে নতুন কিছু শুরু করার সাহসও আর্থিক স্বচ্ছলতা দিতে পারে।

তবে একজন মানুষের ভালো থাকার জন্য শুধু আয় যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রিয় মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, নিজের জন্য কিছুটা সময়, নিরাপদ পরিবেশ, কাজের সন্তুষ্টি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চয়তা। একই আয়ের দুজন মানুষের সুখের মাত্রাও ভিন্ন হতে পারে। একজন হয়তো পছন্দের কাজ করেন এবং পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান; অন্যজন হয়তো বেশি উপার্জন করেন কিন্তু প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা কাজ করেন, নিজের জীবন উপভোগ করার সময়ই তাঁর হাতে থাকে না।

তাই “টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না” কথাটি যতটা সত্য, “টাকার কোনো ভূমিকা নেই” কথাটাও ততটাই অসম্পূর্ণ। পকেটে টাকা না থাকলে জীবনের ছোট ছোট আনন্দও দুশ্চিন্তার নিচে চাপা পড়ে যায়। হয়তো সুখের সবচেয়ে সঠিক সংজ্ঞা এমন একটি জীবন, যেখানে মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পরও মানুষ নিজের পছন্দ, প্রিয়জন ও নিজের জন্য কিছু জায়গা রাখতে পারেন। টাকা সেই জায়গা তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সেই জায়গাকে প্রকৃত সুখে ভরে তোলার কাজ শেষ পর্যন্ত মানুষকেই করতে হয়।

তথ্যসূত্র: পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটি জার্নাল; ছবি: পেকজেলসডটকম