বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে গিয়ে প্রায়ই আমরা শব্দ দুটোকে এক করে ফেলি। বিশেষ করে নিকোলা টেসলার নাম উচ্চারিত হলেই প্রশ্ন ওঠে—তিনি আসলে বিজ্ঞানী, নাকি উদ্ভাবক? জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে তাঁর ভাবমূর্তি এক ‘পাগলা বিজ্ঞানী’র মতো হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এই বিভ্রান্তি দূর করতে হলে প্রথমে ‘আবিষ্কার’ ও ‘উদ্ভাবনের’ সীমানা স্পষ্ট করতে হবে।

আবিষ্কার হলো প্রকৃতির ভল্টে লুকিয়ে থাকা কোনো নিয়ম বা বস্তু উন্মোচন করা; যা আগে থেকেই ছিল, কেবল আমাদের অজানা ছিল। যেমন ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা মহাদেশ খুঁজে পেয়েছিলেন—তৈরি করেননি। একইভাবে জন লগি বেয়ার্ড টেলিভিশন তৈরি করেননি, বরং তার কার্যপ্রণালী উন্মোচন করেছিলেন। আইজ্যাক নিউটন মহাকর্ষ বল আবিষ্কার করেছিলেন, কিন্তু তা সৃষ্টিও করেননি। নিউটনের জন্মের বহু আগে থেকেই আপেল নিচের দিকে পড়ত; তিনি কেবল প্রকৃতির এই গোপন নিয়মটি মানুষের সামনে তুলে ধরেন। আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের পেনিসিলিন ছত্রাক খুঁজে পাওয়া কিংবা ডিএনএর গঠন বের করাও এ ধরনের আবিষ্কার।

অন্যদিকে উদ্ভাবন হলো শূন্য থেকে নতুন কিছু নির্মাণ—যা প্রকৃতিতে আগে কখনো ছিল না। মানুষের কল্পনাশক্তি ও প্রকৃতির নিয়মকে একত্রিত করে তৈরি করা বস্তুই উদ্ভাবন। আদিম মানব যখন প্রথম পাথরকে গোল করে চাকা বানিয়েছিল, তখন সে প্রকৃতির নিয়ম বদলায়নি; বরং সেই নিয়মকে কাজে লাগিয়ে নতুন যন্ত্র তৈরি করেছিল। রাইট ভাইদের উড়োজাহাজ, হাতের স্মার্টফোন কিংবা মাথার ওপর ঘোরা ফ্যান—সবই উদ্ভাবনের ফল।

আলবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন বিশুদ্ধ বিজ্ঞানী। তাঁর কাজ ছিল মহাবিশ্বের কার্যপ্রণালী বোঝা। খাতা-কলম ও চক নিয়ে কালো বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আপেক্ষিকতার সূত্র আবিষ্কার করেন। আলো কীভাবে চলে, সময় কীভাবে বাঁকানো যায়—এসব তিনি গাণিতিক ভাষায় ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু নিজের হাতে কোনো টাইম মেশিন বা যন্ত্র তিনি বানাননি। তিনি শুধু প্রকৃতির নিয়ম উন্মোচন করেছিলেন।

তামাস আলভা এডিসনের পরিচয় ছিল উল্টো। বিদ্যুৎ কীভাবে কাজ করে, তার গাণিতিক সূত্র তিনি হয়তো গভীরভাবে জানতেন না, কিন্তু সেই শক্তিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তা তিনি জানতেন। বৈদ্যুতিক বাতি প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না। হাজারবার ব্যর্থ হয়ে ল্যাবরেটরিতে ঘাম ঝরিয়ে তিনি আলো তৈরি করার একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। বিজ্ঞানীরা নিয়ম খোঁজেন; উদ্ভাবকেরা সেই নিয়মকে ব্যবহার করে নতুন বস্তু গড়েন।

নিকোলা টেসলার ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট। ইন্টারনেটের কল্যাণে তিনি এখন জনপ্রিয় সংস্কৃতির পরিচিত চরিত্র। অনেকে তাঁকে ‘পাগলা বিজ্ঞানী’ বলেন। কিন্তু টেসলার জীবনী ঘাঁটলে দেখা যায়, তাঁর মস্তিষ্কে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ছিল প্রকৌশলীর দক্ষ হাত। তিনি কেবল প্রকৃতির নিয়ম আবিষ্কার করেই থেমে থাকেননি; বরং সেই নিয়মকে কাজে লাগিয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবন বদলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছিলেন।

বিদ্যুৎ বা চৌম্বকত্ব টেসলা আবিষ্কার করেননি। মাইকেল ফ্যারাডে ও জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল আগেই বিদ্যুতের নিয়মকানুন উন্মোচন করেছিলেন। কিন্তু টেসলা সেই জ্ঞানকে পুঁজি করে নিজের মস্তিষ্কে একটি ঘূর্ণায়মান চৌম্বক ক্ষেত্রের ছবি আঁকেন। এরপর ল্যাবরেটরিতে গিয়ে নিজের হাতে এমন একটি প্রত্যাবর্তী প্রবাহের (এসি) মোটর তৈরি করেন, যা আধুনিক বিশ্বের ভিত গড়ে দিয়েছে। শুধু গবেষণাপত্র লিখে রাখলে তিনি বিজ্ঞানী হতেন; কিন্তু তিনি একটি যন্ত্র বানিয়ে পেটেন্ট নিয়েছিলেন। তাই তিনি নিখাদ উদ্ভাবক।

টেসলার অন্যান্য কাজের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। টেসলা কয়েল ব্যবহার করে তিনি ঘরের ভেতর কৃত্রিম বজ্রপাত তৈরি করতেন। ১৮৯৮ সালে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে তিনি রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে দূর থেকে একটি খেলনা নৌকা চালিয়ে দর্শকদের চমকে দেন। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম দূরনিয়ন্ত্রণযোগ্য যন্ত্র। তিনি রাডার, এক্স-রে এবং তারহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালনের মতো অবিশ্বাস্য ধারণারও যন্ত্ররূপ দিয়েছিলেন। টেসলার নামে প্রায় তিনশ পেটেন্ট ছিল। মনে রাখতে হবে, পেটেন্ট কেবল উদ্ভাবনের জন্য দেওয়া হয়; মহাকর্ষ বা অক্সিজেনের জন্য পেটেন্ট দাবি করা যায় না, কারণ সেগুলো কারো তৈরি নয়।

তাহলে টেসলাকে নিয়ে এত বিভ্রান্তি কেন? এর একটি কারণ তাঁর চিন্তার গভীরতা। এডিসনের মতো কেবল বারবার ব্যর্থ হওয়ার পদ্ধতিতে তিনি বিশ্বাস করতেন না। যেকোনো যন্ত্র তৈরির আগে টেসলা নিজের মস্তিষ্কের ভেতরেই তার ত্রিমাত্রিক নকশা দাঁড় করিয়ে ফেলতেন। মনে মনেই যন্ত্রটি চালিয়ে দেখতেন কোথাও ঘর্ষণ হচ্ছে কি না। তাঁর এই অসাধারণ মানসিক ক্ষমতা ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের কারণেই সাধারণ মানুষ তাঁকে বিশুদ্ধ বিজ্ঞানীর কাতারে ফেলে দেন।

কিন্তু দিন শেষে টেসলার পরিচয় হলো সর্বকালের অন্যতম সেরা উদ্ভাবক। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো কবিতার মতো পড়তেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আসল জাদু ছিল সেই সূত্রগুলোকে লোহালক্কড় ও তামার তারের সাহায্যে বাস্তব রূপ দেওয়ায়। তাই কেউ যদি বলেন, ‘অমুক লোক একটি দারুণ জিনিস আবিষ্কার করেছে, যা দিয়ে সহজে রান্না করা যায়’—তাকে মনে করিয়ে দেওয়া উচিত, রান্নার যন্ত্র আবিষ্কার করা যায় না, তা কেবল উদ্ভাবন করতে হয়। সূত্র: মেরিয়াম-ওয়েবস্টার ডটকম ও হিস্ট্রি ডটকম।