ডিজিটাল দুনিয়ার অন্ধকার প্রান্তে বাংলাদেশের লাখ লাখ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বেচাকেনার খবর সামনে এসেছে। 'ম্যাডর্যাক্স' নামে পরিচিত এক হ্যাকার গোষ্ঠী দাবি করছে, তাদের কাছে দেশের ৬০ লাখ মানুষের জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি রয়েছে, যা তারা ডার্ক ওয়েবে বিক্রি করছে। রোববার দুপুরে 'ডার্ক ফোরামস ডট আর ইউ' নামের একটি ওয়েবসাইটে এই বিক্রয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই গোষ্ঠীর দাবি অনুযায়ী, এসব সিভি সংগ্রহ করা হয়েছে বাংলাদেশের জনপ্রিয় চাকরির ওয়েবসাইট বিডিজবসের ডেটাবেজ থেকে।

বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতিটি সিভিতে থাকা তথ্যের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তির নাম, মোবাইল ফোন নম্বর, বাসার ঠিকানা, ই-মেইল ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণের বিবরণ। পুরো ডেটাসেটের একটি কপির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার মার্কিন ডলার। সর্বোচ্চ পাঁচজন ক্রেতার কাছে এই তথ্যগুলো বিক্রি করা হবে বলেও জানানো হয়েছে। অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে পেটিএম, ওয়াইজ, পেইউ এবং বাইন্যান্সের মতো প্ল্যাটফর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

হ্যাকার গোষ্ঠীটির দাবির সত্যতা প্রমাণের জন্য তারা ১৪৮টি সিভির নমুনাও প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই পুরোনো। ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে যেসব সিভি সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছিল, সেগুলোর সংখ্যাই বেশি। প্রকাশিত নমুনাগুলোর মধ্যে দুইজনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা দুজনই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী এবং কয়েক বছর আগে বিডিজবসে নিজেদের সিভি জমা দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন।

এই বিশাল পরিসরে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও প্রযুক্তিবিষয়ক বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা প্রথম আলোকে বলেন, একটি সিভিতে থাকা নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল, ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মজীবনের তথ্য একত্রে পেলে যেকোনো সাইবার অপরাধী একজন ব্যক্তির সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করে ফেলতে পারে। এরপর সেই তথ্য ব্যবহার করে লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিং আক্রমণ, ভুয়া চাকরির প্রস্তাব পাঠানো, পরিচয় জালিয়াতি এবং আর্থিক প্রতারণার মতো ঘটনা ঘটানো সম্ভব।

অবশ্য বিডিজবস কর্তৃপক্ষ তাদের ডেটাবেজ থেকে তথ্য ফাঁসের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর প্রথম আলোকে বলেন, শুরু থেকেই ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে বিডিজবস। তথ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এবং কে ব্যবহারকারীর প্রোফাইল দেখতে পারবেন বা পারবেন না, সে বিষয়েও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিডিজবসে নিবন্ধিত কয়েক লাখ নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান চাকরিপ্রার্থীদের তথ্য দেখতে পারে, তবে শুধুমাত্র নিজেদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্যই তারা সেসব ব্যবহার করতে পারবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি সেই তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করে এবং বিষয়টি বিডিজবসকে জানানো হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।