সামাজিক মাধ্যমে গাছের সঙ্গে কথা বলা বা গান গাওয়ার কথা শোনা গেলেও, এটি কেবল শখের বিষয় নয়—এমন দাবি করেছে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি নতুন প্রতিষ্ঠান। হাইভিয়া নামের ওই স্টার্টআপ বলছে, সাধারণ সুর নয়, বরং নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে গাছের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কোনো জিনগত পরিবর্তন বা রাসায়নিক সার ছাড়াই এই পদ্ধতিতে ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তাদের পরীক্ষায় উঠে এসেছে।

প্রাণীদের মতো কান না থাকলেও উদ্ভিদরা চারপাশের পরিবেশের কম্পন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উপলব্ধি করতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শুঁয়োপোকা যখন পাতা চিবিয়ে খায়, তখন সেই শব্দ বা কম্পনের মাধ্যমে গাছ সতর্ক হয়ে প্রতিরক্ষামূলক রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করতে শুরু করে। এই ধারণাকেই কাজে লাগিয়েছে হাইভিয়া। তাদের তৈরি বায়োঅ্যাকোস্টিক কাল্টিভেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন প্রোটোকল—যার সংক্ষিপ্ত নাম বিসিসিপি—একটি নির্দিষ্ট শব্দস্তর ব্যবহার করে উদ্ভিদের জীবনচক্রজুড়ে প্রভাব ফেলে।

প্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রেয়া অট-ডাহল ব্যাখ্যা করেন, এটি কোনো সাধারণ সংগীত বা এলোমেলো শব্দঝলকানি নয়। বরং এটি বিভিন্ন সাউন্ড ও ফ্রিকোয়েন্সির একটি সুপরিকল্পিত সমন্বয়। সাধারণ স্পিকারের মাধ্যমেই এই শব্দ বাজানো যায় এবং এর মাত্রা ৮০ ডেসিবেলের নিচে রাখা হয়, যা পরিবেশের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত।

সম্প্রতি বেল পেপার, সয়াবিনসহ সাতটি ভিন্ন প্রজাতির গাছের ওপর এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। ফলাফল বেশ চমকপ্রদ। একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে ফলন প্রায় ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্য একটি পদ্ধতিতে উৎপাদন ৫৯ শতাংশ বেড়েছে, পাশাপাশি গাছের পূর্ণতা অর্জনের সময় ১৪ শতাংশ কমে গেছে এবং পানির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। একটি তামাকজাতীয় গাছের ওপর তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন পরীক্ষায় বিক্রয়যোগ্য ফলন প্রায় ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পানি সাশ্রয় হয়েছে ৩৪ শতাংশ।

এই প্রোটোকলের বিশেষত্ব হলো, বীজ বোনার পর থেকে গাছের পুরো জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শব্দের ধরন পরিবর্তিত হয়। চারাগাছের সময় মূল লক্ষ্য থাকে শিকড়ের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, আর পূর্ণাঙ্গ পর্যায়ে বেশি কুঁড়ি ও ফলনের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়। বয়স অনুযায়ী শব্দের এই পরিবর্তনই হাইভিয়ার পদ্ধতিকে পূর্ববর্তী সাধারণ শব্দ-পরীক্ষা থেকে আলাদা করেছে বলে প্রতিষ্ঠাতা জানান।

বিজ্ঞানের পেছনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মানুষের কানের ভেতরের রোমকূপ শব্দের কম্পনে বেঁকে গিয়ে ক্যালসিয়াম আয়নের প্রবেশ ঘটায় এবং স্নায়ুতে সংকেত পাঠায়। আন্দ্রেয়ার মতে, উদ্ভিদের কোষেও একই ধরনের আয়ন চ্যানেল রয়েছে; শব্দের কম্পনে সেগুলো সক্রিয় হয়ে ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়াম আয়নের চলাচলে প্রভাব ফেলে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের গবেষক সাইমন গিলরয় উল্লেখ করেন, গাছ যে শব্দে সাড়া দেয় তা বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হলেও, ঠিক কোন বায়োকেমিক্যাল প্রক্রিয়ায় কম্পন সংকেতে রূপান্তরিত হয় তা এখনো অজানা। তিনি আরও মনে করেন, হয়তো এই শব্দতরঙ্গ সরাসরি গাছকে নয়, বরং মাটিকেই প্রভাবিত করছে।

হাইভিয়ার গবেষণাপত্রটি এখনো পিয়ার-রিভিউ বা অন্য বিজ্ঞানীদের দ্বারা যাচাই করা হয়নি। গিলরয়ের ভাষায়, এটি কীভাবে কার্যকর হয় তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবু যদি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় এটি সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়, তবে কৃষিক্ষেত্রে এটি এক বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। তাঁর মতে, কৃষিতে ফলন ৫ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়াও বিরাট অর্জন; আর যদি এই পদ্ধতি সত্যিই কার্যকর হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ একটি অগ্রগতি। সূত্র হিসেবে নিউ সায়েন্টিস্টের প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে।