করোনাভাইরাস মহামারির সময় ব্যাপকভাবে গৃহীত প্রযুক্তি দিয়ে হাজার হাজার নিয়োগকর্তা এখনো কর্মীদের অবস্থান, উৎপাদনশীলতা ও যোগাযোগ নজরে রাখছেন। সাম্প্রতিক একটি যৌথ তদন্তে দেখা গেছে, এসব ডিজিটাল সরঞ্জামের মাধ্যমে কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য বাইরের প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাচ্ছে, যা গোপনীয়তার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে।

ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের গবেষকরা নয়টি জনপ্রিয় নজরদারি প্ল্যাটফর্ম পরীক্ষা করেন—যার মধ্যে হাবস্টাফ, ডেপুটি ও টাইম ডক্টর ২ অন্তর্ভুক্ত। গবেষকরা নিয়োগকর্তা হিসেবে নিবন্ধন করে অ্যাপগুলো ব্যবহার করেন এবং কর্মীর লগ থেকে প্রকৃতপক্ষে কী তথ্য বাইরে পাঠানো হয়, তা পর্যবেক্ষণ করেন। প্রতিটি প্ল্যাটফর্মই কর্মীর শনাক্তকরণ তথ্য—নাম ও ইমেইলসহ—বাইরের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছে। এভাবে ১২১টি নথিভুক্ত ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ফেসবুক, গুগল, মাইক্রোসফট ও অ্যাপলভিনের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে।

পাশাপাশি নয়টি অ্যাপ কর্মীদের অনলাইন কার্যক্রম—আইপি ঠিকানা, ডিভাইসের তথ্য ও ব্রাউজিং ডেটা—১৪৫টি তৃতীয় পক্ষের ডোমেইনে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়ার সার্চ কোম্পানি ইয়ানডেক্সও রয়েছে। তৃতীয়াংশ প্ল্যাটফর্ম কর্মীর সুনির্দিষ্ট অবস্থান ট্র্যাক করতে সক্ষম, এমনকি অ্যাপটি ব্যাকগ্রাউন্ডে চলাকালীন বা কর্মী কাজের বাইরে থাকাকালীনও। তিনটি অ্যাপের ক্ষেত্রে শুধু লগইন করতে ফোনের গতি সংবেদকের প্রবেশাধিকার প্রয়োজন হয়।

কর্মীদের ওপর নজরদারির এই প্রবণতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন কর্মীদের সংগঠন কাওয়ার্কার-এর গবেষণা ও নীতি পরিচালক উইলনেইদা নেগ্রন। তার মতে, শ্রমবাজারে সবচেয়ে কম ক্ষমতাসম্পন্ন কর্মীরাই প্রায়ই অনধিকারপ্রবেশমূলক ডেটা সংগ্রহের পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র হয়ে ওঠেন। অনেক নিয়োগকর্তা স্বচ্ছভাবে এই সরঞ্জাম ব্যবহার করলেও, কিছু ক্ষেত্রে কর্মীদের র‍্যাঙ্কিং ও স্কোরিং এমনভাবে করা হয় যা তাদের কাছে অজানা থাকে। তিনি আরও বলেন, কর্মীদের একত্রিত হতে হবে, কারণ নজরদারি ও ট্র্যাকিংয়ের শক্তিগুলো অত্যন্ত দ্রুত এগোচ্ছে।

ফার্মাসিস্ট ল্যানি ডুয়ং একটি মেডিকেল ক্লিনিকে দীর্ঘমেয়াদি রোগীর সঙ্গে কাজ করতেন। তার নিয়োগকর্তা ফোনকল ও অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময়কাল ট্র্যাক করতেন এবং কেন তিনি প্রতিটি রোগীর সঙ্গে এত সময় ব্যয় করেন, তা নিয়ে কর্মমূল্যায়নের সময় প্রশ্ন তুলতেন। ডুয়ং বলেন, প্রতিটি মিনিট গোনা হতো, যা তার কাছে অযৌক্তিক মনে হতো। অবিরাম চাপের মুখে তিনি চিকিৎসা ছুটি নেন এবং পরে ইউনিয়ন গঠনের প্রচেষ্টায় অন্য ফার্মাসিস্টদের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার দাবি, চিকিৎসা ছুটির পর তার চাকরি বাতিল করা হয়। তিনি আরও বলেন, তিনি আশাবাদী ছিলেন যে অন্যরাও তার সঙ্গে কথা বলবেন, কিন্তু তা বাস্তবে ঘটেনি।

অন্যদিকে, কলেজের লেখার ক্লাসে পাঠদানের সময় শিক্ষক অ্যারিয়ানা আনায়া জানতে পারেন যে, স্কুলের লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে একজন প্রশাসক তার ছাত্রছাত্রীদের আপলোড করা কাগজপত্র ও তার দেওয়া মন্তব্য পড়ছেন। ছাত্রছাত্রীরা প্রায়ই নির্যাতন, খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা ও পারিবারিক ট্রমার মতো অন্তরঙ্গ বিষয় নিয়ে লিখতেন। আনায়া জানান, স্কুলটি অনলাইন লার্নিং সিস্টেমের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত কাগজপত্র ও মন্তব্য পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে, যা বিশেষভাবে গোপন রাখা উচিত ছিল। তার এক সহকর্মী তার মন্তব্যের অপ্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গি ও কোর্স সিলেবাস মেনে না চলার অভিযোগ তুললে কয়েক মাস পর তার শিক্ষণ চুক্তি নবায়ন করা হয়নি। এতে তিনি নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেন এবং এটি তাকে বেশ ভীত করে তোলে।

রাজ্যভিত্তিক আইনের প্রসঙ্গ টেনে বিশেষজ্ঞরা জানান, নিউইয়র্ক, কানেক্টিকাট, ডেলাওয়্যার ও মেইনে নিয়োগকর্তাদের কর্মীদের নজরদারির বিষয়ে অবহিত করতে হবে। মেইনের আইন আরও কঠোর—কর্মীর বাড়ি বা ব্যক্তিগত গাড়িতে দৃশ্যমান নজরদারি নিষিদ্ধ, যদি না তা কাজের দায়িত্বের অংশ হয়। গোপনীয়তা ও এআই অনুপালন ব্যবস্থাপক এডওয়ার্ড হ্যালের মতে, ‘কাজের দায়িত্ব’ কী বোঝায়, সেটিই এখন প্রথম প্রশ্ন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, টেলিহেলথ নার্সের জন্য ক্যামেরা কাজের অংশ হতে পারে, কিন্তু সাধারণ ডেস্ক কাজের জন্য উৎপাদনশীলতা ওয়েবক্যাম প্রায় নিশ্চিতভাবেই নয়।

ডিজিটাল গোপনীয়তা নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের রাজ্য বিষয়ক পরিচালক হেইলি সুকায়ামা বলেন, কাজের জন্য ইস্যু করা যন্ত্রে কোনো না কোনো নজরদারি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি পরামর্শ দেন, কর্মীরা যেন তাদের শিল্পে ডেটা সংগ্রহ ও নজরদারির প্রবণতা নিয়ে গবেষণা করেন। তথ্য না থাকলে কর্মীরা নজরদারির সময় উন্মোচিত তথ্যের মুখোমুখি হয়ে অপ্রস্তুত থাকতে পারেন। তিনি আরও বলেন, যারা কাজের জন্য দেওয়া যন্ত্রে নজরদারি নিয়ে উদ্বিগ্ন, তারা সতর্কভাবে ও কৌতূহলের সঙ্গে বিষয়টি ব্যবস্থাপকের কাছে তুলতে পারেন।

ডেটা অ্যান্ড সোসাইটির শ্রম ভবিষ্যৎ উদ্যোগের পরিচালক আইহা নগুয়েন পরামর্শ দেন, কর্মীরা জানতে পারেন তাদের সংগঠন কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে। মাইক্রোসফট অফিস ও জুমের মতো সাধারণ সফটওয়্যারে কর্মীর উৎপাদনশীলতা ট্র্যাক করার সরঞ্জাম থাকলেও, সেগুলো সবসময় সক্রিয় থাকে না। এগুলো চালু আছে কিনা জানা কঠিন, কারণ এগুলো প্রোগ্রামের ভেতরেই নির্মিত। তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ের জন্য কাজের যন্ত্র ব্যবহার না করাই উত্তম, যদিও ফোন বদলানো ক্লান্তিকর হতে পারে। এটি মানুষকে সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

অতিরিক্ত প্রতিবেদন করেছেন নিক লিচেনবার্গ। এই প্রতিবেদনটি প্রথমে ফরচুন ডট কম-এ প্রকাশিত হয়েছিল।