একজন চিকিৎসক যখন নিজেই সেই রোগে আক্রান্ত হন যার চিকিৎসা তিনি দীর্ঘকাল ধরে করছেন, তখন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে যায়। এমনই এক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক। স্তন ক্যানসার জয় করা এই চিকিৎসকের কাছে এই যাত্রাটি ছিল জীবনকে নতুন করে চেনার এক মাধ্যম।
২০১৯ সাল থেকে তাঁর স্তনে একটি ছোট চাকা ছিল, যাকে তিনি শুরুতে নিরীহ মনে করেছিলেন। আলট্রাসাউন্ড গাইডেড এফএনএসি পরীক্ষায় রিপোর্ট এসেছিল 'ফাইব্রোসিস্টিক ডিজিজ', যা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিল। ২০২০ সালের মার্চ মাসে অস্ট্রেলিয়ায় একটি হ্যান্ড সার্জারি কনফারেন্সে থাকাকালীন তিনি লক্ষ্য করেন যে, স্তনের সেই অংশটি আগের চেয়ে শক্ত হয়ে গেছে। দেশে ফিরে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিলেও কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সব পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে তিন জন অ্যাডভান্সড ব্রেস্ট ক্যানসার রোগীকে দেখার পর তিনি গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং কোর বায়োপসি করান। রিপোর্টে ক্যানসারের সম্ভাবনা দেখা দিলে ম্যামোগ্রাম ও এমআরআই-এর মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে স্তন ক্যানসার শনাক্ত হয়।
চিকিৎসক হিসেবে নিজের অসুস্থতার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ হতে না পারা এবং কেবল এফএনএসি-র ওপর নির্ভর করার বিষয়টি তাঁকে একটি বড় শিক্ষা দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, রোগীর জন্য যে সতর্কতা একজন চিকিৎসক দেখান, নিজের ক্ষেত্রে তা অনেক সময় হারিয়ে যায়। এরপর তিনি একজন সিনিয়র সার্জিক্যাল অনকোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যান। অস্ত্রোপচার পরবর্তী সময়ে ওয়ার্ডে থাকা অবস্থায় কথা বলতে না পারার যে অসহায়ত্ব তিনি অনুভব করেন, তা তাঁকে একজন রোগীর প্রকৃত মানসিক অবস্থা বুঝতে সাহায্য করে। পরবর্তী সাত মাস কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির দীর্ঘ লড়াই শেষে তিনি ক্যানসারমুক্ত হন।
এই অভিজ্ঞতা তাঁর ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন তিনি সন্দেহজনক কোনো গোটা দেখলে দ্রুত আলট্রাসাউন্ড, ম্যামোগ্রাম বা এমআরআই করার বিষয়ে দ্বিধা করেন না এবং কোর বায়োপসি ছাড়া অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন না। এছাড়া তিনি এখন মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ডের গুরুত্ব এবং চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে রোগীকে ও তাঁর পরিবারকে বিস্তারিত জানানোর প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে কম বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে প্রজনন সক্ষমতা এবং বগলের সার্জারির পর হাতের যত্নের বিষয়ে তিনি এখন অধিক সচেতন।
ব্যক্তিগত জীবনে এই লড়াই তাঁকে সাতটি মূল শিক্ষা দিয়েছে: নিজের প্রয়োজনকে অবহেলা না করা, প্রতিটি দিনের মূল্য বোঝা, পরিকল্পিতভাবে কাজ করা, মানসিক চাপ কমানো, লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকা, সাহসের সঙ্গে ‘না’ বলা এবং প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য নেওয়া। তিনি বিশ্বাস করেন, ক্যানসার জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র, পুরো জীবন নয়। জীবনকে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে না রেখে বর্তমান মুহূর্তেই বাঁচতে হবে।
বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামে একটি অলাভজনক ও মানবিক ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ ‘চট্টগ্রাম কল’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। চিকিৎসক ও ক্যানসারজয়ী হিসেবে অর্জিত অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি এই মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে আরও অনেক মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান।




