পাবনার চাটমোহরের প্রাচীন জনপদে ব্রিটিশ আমলের স্মৃতিবিজড়িত এক মিষ্টির দোকানের ঐতিহ্য আজও অম্লান। শহরের কৃষ্ণদাস কুণ্ডুর গদিঘরের সামনে টিনের চালের একটি ছোট দোকান থেকে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মনো পাল। ইতিহাস অনুযায়ী, চাটমোহরে প্রথমবার ‘রসমালাই’ তৈরির কৃতিত্ব মনো পালের। তাঁর সেই ক্ষুদ্র দোকানের মিষ্টির খ্যাতি বর্তমানে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

১৯৮২ সালে মনো পালের মৃত্যুর পর এই ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাঁর দৌহিত্র কমল কুমার পাল। বর্তমানে দোলবেদীতলা এলাকায় অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখা হয়েছে ‘অন্নপূর্ণা মিষ্টান্ন ভান্ডার’। প্রয়াত পিতা সমরেন্দ্র নাথ পালের কাছ থেকে পাওয়া পুরনো রেসিপি এবং সেই চিরচেনা স্বাদ অক্ষুণ্ণ রেখে মিষ্টি তৈরি করে চলেছেন কমল পাল। তিনি গর্বের সাথে জানান, তাঁর দাদামশাই যেভাবে মিষ্টি তৈরি করে গেছেন, তাঁরা ঠিক সেই পদ্ধতি এবং মান বজায় রাখছেন; রেসিপির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।

সময়ের সাথে সাথে মিষ্টির দামেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ১৯৬৬ সালে যখন মনো পাল রসমালাই তৈরি করতেন, তখন সের দরে এর দাম ছিল মাত্র চার টাকা, আর দুধের দাম ছিল তিন-চার আনা। ১৯৮২ সালে কমল পাল দায়িত্ব নেওয়ার সময় রসমালাইয়ের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ টাকা সের। বর্তমানে এই দোকানে প্রতি কেজি রসমালাইয়ের মূল্য ৪২০ টাকা। এছাড়া অন্যান্য মিষ্টির দামও নির্ধারিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন হারে—যেমন রসগোল্লা ২৮০ টাকা, সন্দেশ ৪২০ টাকা, রাজভোগ ও প্যাড়া ৪০০ টাকা, কাটারি ৪৫০ টাকা, ছানার জিলাপি ৩৭০ টাকা, চমচম ৩৫০ টাকা, রসকদম ৪০০ টাকা, কালোজাম ৩৬০ টাকা এবং দই ২২০ টাকা প্রতি কেজি।

মূল্য বৃদ্ধি পেলেও ক্রেতাদের ভিড় এবং মিষ্টির প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমেনি। বিশেষ করে দুধ ও ছানার নিখুঁত মিশ্রণে তৈরি রসমালাইয়ের অতুলনীয় স্বাদ ও গুণগত মান একে অনন্য করে তুলেছে। আধুনিক যুগের প্রভাব পড়লেও এখানে এখনো মাটির হাঁড়িতে মিষ্টি নিয়ে যাওয়ার পুরনো সংস্কৃতি বিদ্যমান। শুধু দেশেই নয়, প্রবাসীদের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি এখন বিদেশেও পৌঁছে যাচ্ছে। একটি পরিবারের অবিচল নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের ফলেই চাটমোহরের অন্নপূর্ণা মিষ্টান্ন ভান্ডারের এই গৌরবময় ঐতিহ্য টিকে আছে।