সংস্কৃতি কেবল চর্চার বিষয় নয়, বরং এটি মানুষকে বড় করে, শুদ্ধ করে এবং একে অপরের সঙ্গে সম্প্রীতি তৈরি করে—এই বিশ্বাস থেকে কবি শামীম আজাদ আজীবন সংস্কৃতিচর্চাকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন। সম্প্রতি গ্লিটজের 'আড্ডানামা' অনুষ্ঠানের নবম পর্বে অতিথি হয়ে অভিনেত্রী নিমা রহমানের সঞ্চালিত আলোচনায় নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন এই প্রথিতযশা কবি ও গল্পকার।
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে লন্ডনে বসবাস করা শামীম আজাদ একজন দ্বিভাষিক কবি হিসেবে পরিচিত। বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষাতেই তিনি কবিতা রচনা করেন। তবে তাঁর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তাঁর সৃজনশীলতার মূল ভিত্তি এবং শক্তির উৎস হলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। তবে বিলেতে শিক্ষকতা শুরু করার পর সেখানকার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের কবিতা শেখানোর অনুপ্রেরণায় তিনি ইংরেজি ভাষায় কবিতা লেখা শুরু করেন, যা তাঁকে দ্বিভাষিক কবির পরিচিতি দেয়।
শৈশব ও কৈশোরের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, জন্মস্থান তাঁর ময়মনসিংহে হলেও বাবার চাকরির সূত্রে জামালপুরে বড় হয়েছেন। তাই তাঁর মতে, জৈবিক জন্মস্থানের পাশাপাশি জামালপুর তাঁর মনের জন্মভূমি। তাঁর পরিবারের মধ্যেই ছিল শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগ। বাবা-মায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী এবং নাটকের আয়োজনের মধ্য দিয়েই তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়েছে। স্কুল জীবনেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং নেতৃত্বদানে আগ্রহী। তাঁর এই প্রবল জীবনীশক্তিকে সঠিক পথে চালিত করতে তাঁর বাবা তাঁকে সংস্কৃতির সাথে যুক্ত করার কথা বলেন, যা পরবর্তীতে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
কলেজ জীবনে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে তিনি প্রেমের গল্প লেখা শুরু করেন এবং তাঁর প্রথম গল্প 'এক পশলা বৃষ্টি' জনপ্রিয় পত্রিকা 'বেগম'-এ প্রকাশিত হয়, যেখানে চিত্রশিল্পী হাশেম খানের ইলাস্ট্রেশন ছিল। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাবা ইংরেজি সাহিত্য পড়ার কথা বললেও, মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বদের অনুপ্রেরণায় তিনি বাংলা সাহিত্যে পড়ার জেদ ধরেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শামীম আজাদ জানান, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে সরাসরি রণাঙ্গনে না গেলেও মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ জোগাতে এবং তাঁদের গোপন আশ্রয় দিতে সহায়তা করেছিলেন। সেই সময়ের এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার কথা তিনি স্মরণ করেন, যে তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল কিন্তু স্বাধীনতার পর আর যার দেখা মেলেনি। এই স্মৃতি তাঁর মনে আজও গভীর ক্ষত হয়ে আছে।
কর্মজীবনের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, তিনি সানবিমস স্কুল, হলিক্রস, তিতুমীর এবং ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশনের ধারাবাহিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'জীবন যেমন'-এর স্ক্রিপ্ট লেখা ও সম্পাদনার পাশাপাশি প্রথমবার দেশি পোশাকের ক্যাটওয়াক প্রবর্তন করেছিলেন তিনি। এছাড়া সাপ্তাহিক 'বিচিত্রা' পত্রিকায় তাঁর লেখা ও লাইফস্টাইল বিষয়ক কাজ তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়, যার ফলে অনেকে তাঁকে 'বিচিত্রার শামীম আজাদ' হিসেবে চেনেন।
গল্পকার হিসেবে পরিচিত থাকলেও কবি হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর। কবি রফিক আজাদের উৎসাহে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন এবং ১৯৮৩ সালের একুশে বইমেলায় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ভালোবাসার কবিতা' প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে বিলেতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক স্বল্পতার সুযোগে তিনি সেখানে পাড়ি জমান এবং সেখানেই ইংরেজি ভাষায় কাব্যচর্চা শুরু করেন। পরিশেষে তিনি মনে করেন, দেশ ছেড়ে প্রবাসে থাকলেও একজন নাগরিক হিসেবে তিনি তাঁর দেশের দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং সেই দায়বদ্ধতা থেকেই তাঁর লেখালেখি ও চর্চা অব্যাহত রয়েছে।




