বাংলাদেশের সোনাদিয়া দ্বীপে একসময় হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির আনাগোনা থাকলেও বর্তমানে সেখানে বিরল প্রজাতির পাখিদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে। বিশেষ করে চামচঠুঁটো বাটান, বড় নট এবং নর্ডম্যানের সবুজপা—এই তিনটি প্রজাতির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বিশ্বব্যাপী বিপন্ন পাখির তালিকায় থাকা এই প্রজাতিগুলো এখনো সোনাদিয়ায় দেখা গেলেও তাদের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক হ্রাস পেয়েছে।
একজন নিয়মিত পাখি পর্যবেক্ষকের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, গত দুই দশকে সোনাদিয়া দ্বীপের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের আনাগোনা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের ফলে এই প্রভাব পড়েছে পাখিদের ওপর। যদিও দ্বীপে কাদাচরের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে পাখির সংখ্যা বাড়েনি। সাধারণত প্রতি শীত মৌসুমে এখানে ৭ থেকে ১০ হাজার পরিযায়ী পাখি আসত, তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে উপকূলজুড়ে সৈকত পাখিদের সংখ্যা কমছে। গবেষক সায়েম চৌধুরীর একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ২০ প্রজাতির সৈকত পাখির মধ্যে ১২ প্রজাতির সংখ্যাই উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিপন্ন এই তিন প্রজাতির মধ্যে চামচঠুঁটো বাটান একবার ১০-১৫ বছর আগে গড়ে ৩০টি দেখা যেত, যা এখন ১০টির নিচে নেমে এসেছে। এমনকি গত শীত মৌসুমে মাত্র তিনটি পাখির দেখা মিলেছে, যেখানে ২০১৭ সালে একসঙ্গে ১২টি দেখা গিয়েছিল। এই ক্ষুদ্র পাখিটি রাশিয়ার চুকোটকা ও কামচাটকা অঞ্চল থেকে আট হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সোনাদিয়ায় আসে। পুরো পৃথিবীতে এই প্রজাতির মাত্র ৪৪৩টি পাখি টিকে আছে। আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই পাখিটি সোনাদিয়া থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
অন্যদিকে, বড় নটের সংখ্যাও দ্রুত কমছে। বাংলাদেশে এই প্রজাতির পাখি বছরে গড়ে ১৯.৯ শতাংশ হারে হ্রাস পাচ্ছে। একসময় সোনাদিয়ায় প্রায় ৫০টি বড় নট দেখা গেলেও এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এরা মূলত দ্বীপের কাদাচরে অবস্থান করে এবং অনেক সময় লাল নটের সাথে এদের গুলিয়ে ফেলা হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি নর্ডম্যানের সবুজপা-র। এই বিরল পাখিটি বর্তমানে সোনাদিয়া ছাড়া দেশের অন্য কোথাও প্রায় দেখা যায় না। প্রতি বছর এই প্রজাতির সংখ্যা গড়ে ১৫.৫ শতাংশ করে কমছে।
সোনাদিয়া দ্বীপে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। তবে পরিবেশবিদ ও পাখি পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হলে এই মহামূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বিরল পরিযায়ী পাখিদের চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।




