চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির গুণমান মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ চরম সংকটে পড়েছেন। উত্তর পতেঙ্গার হাউজিং কলোনি রোডের মতো এলাকায় ওয়াসার সংযোগ না থাকায় বাসিন্দারা গভীর নলকূপ স্থাপন করলেও সেখান থেকে লবণাক্ত ও ঘোলা পানি উঠছে। ফলে পানযোগ্য ও রান্নার পানির জন্য তাদের বাজার থেকে জারের পানি কিনতে হচ্ছে। কেবল উত্তর পতেঙ্গাই নয়, দক্ষিণ পতেঙ্গা, কাটগড়সহ নগরের ১০টি এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যেখানে পানি কখনো লালচে আবার কখনো লবণাক্ত হয়ে থাকে।
সাম্প্রতিক তিনটি গবেষণায় চট্টগ্রামের ভূগর্ভস্থ পানির আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সাময়িকী 'ক্লিনার ওয়াটার'-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম ও লক্ষ্মীপুরের পানিতে ধাতব দূষণ তুলনামূলক বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুল হাসানসহ আট গবেষকের এই সমীক্ষায় অ্যালুমিনিয়াম, তামা, আয়রন, ম্যাংগানিজ, ক্রোমিয়াম ও আর্সেনিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, বর্ষাকালের চেয়ে শুষ্ক মৌসুমে পানির মান আরও খারাপ হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে আর্সেনিক ও ম্যাংগানিজের মাত্রা সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে যায়। গবেষকদের মতে, চট্টগ্রামের জটিল ভূতাত্ত্বিক গঠন, অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন এবং অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মানের পরিবর্তন ঘটছে। বিশেষ করে আনোয়ারা, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড ও হাটহাজারি এলাকায় এই ঝুঁকি বেশি।
২০২৪ সালে 'হেলিয়ন' সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডের ১১৭টি নলকূপ পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, প্রায় ৬৩ শতাংশ নমুনায় ম্যাংগানিজ এবং ৫৯ শতাংশে আয়রনের মাত্রা নির্ধারিত সীমার বেশি। যদিও আর্সেনিকের মাত্রা সব জায়গায় বেশি ছিল না, তবে উত্তর পতেঙ্গার একটি মাঝারি গভীর নলকূপে সর্বোচ্চ আর্সেনিক পাওয়া গেছে। এছাড়া ২০২৫ সালে 'জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস অ্যাডভান্সেস'-এ প্রকাশিত শিল্পাঞ্চল কেন্দ্রিক গবেষণায় আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম ও সিসার উপস্থিতি প্রধান উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিল্পকারখানার বর্জ্যকে এই দূষণের অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন গবেষকরা।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, নলকূপ গভীর হলেই পানি নিরাপদ হবে—এমন ধারণা ভুল। তিনি জানান, ৮০০ থেকে ১২০০ ফুট গভীর নলকূপেও অতিরিক্ত আয়রনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তাই পানি ব্যবহারের আগে তার উপাদান পরীক্ষা করা জরুরি। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে ত্বকে কালো দাগ, চামড়া মোটা হওয়া এবং ফুসফুস ও মূত্রথলির ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের উপস্থিতিও শরীরের জন্য ক্ষতিকর, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ওয়াসার নিজস্ব ৫০টি গভীর নলকূপের পাশাপাশি অনুমোদিত প্রায় ৪ হাজার ২০০টি এবং অনুমোদনহীন ৫০ হাজারেরও বেশি গভীর নলকূপ এই শহরে রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক অনিয়ন্ত্রিত নলকূপ ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য নষ্ট করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাহমুদুল হাসান একটি মহাপরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে এলাকাভিত্তিক পানির মানের মানচিত্র তৈরি করে সরকারি তদারকিতে নলকূপ স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।




