মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় কণা নিউট্রিনো, যাকে বিজ্ঞানীরা 'ভুতুড়ে কণা' বলে অভিহিত করেন। সূর্যের কেন্দ্রে সংঘটিত পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে এই কণাগুলো বিপুল পরিমাণে উৎপন্ন হয়। নিউট্রিনোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর অসামাজিকতা; অর্থাৎ, এটি সাধারণ পদার্থের পরমাণুর সঙ্গে খুব কমই মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি নিউট্রিনো আমাদের শরীর ভেদ করে চলে গেলেও আমরা তা অনুভব করতে পারি না। এই রহস্যময় কণাকে শনাক্ত করতে বিজ্ঞানীরা বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০টি বিশেষ ডিটেক্টর স্থাপন করেছেন। জাপানের মোজুমি মাইনের গভীরে অবস্থিত 'সুপার কামিওকান্দি নিউট্রিনো ডিটেক্টর' এর অন্যতম উদাহরণ। এখানে ৪২ মিটার উচ্চতা ও ব্যাসের বিশাল ইস্পাতের ট্যাঙ্কে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অতিবিশুদ্ধ পানি এবং ১৩ হাজার ফটোমাল্টিপ্লায়ার টিউব ব্যবহার করা হয়। যখন নিউট্রিনো পানির অণুর ইলেকট্রনের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে, তখন আলোর চেয়ে দ্রুতবেগে ইলেকট্রন বা পজিট্রন ছুটতে থাকে, যার ফলে নীল রঙের এক ধরনের আভা তৈরি হয়। সোভিয়েত পদার্থবিজ্ঞানী পাভেল চেরেনকভের আবিষ্কৃত এই ঘটনাটি 'চেরেনকভ রেডিয়েশন' নামে পরিচিত, যার জন্য তিনি ১৯৫৮ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
সূর্যের কেন্দ্র থেকে নিউট্রিনো কণাগুলো প্রায় বিনা বাধায় সূর্যের পৃষ্ঠতলে পৌঁছাতে মাত্র ২ সেকেন্ড সময় নেয় এবং সেখান থেকে পৃথিবীতে আসতে আরও সাড়ে আট মিনিট সময় লাগে। তবে আলোর কণা বা ফোটনের যাত্রা এত সহজ নয়। সূর্যের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন ফিউশন প্রক্রিয়ায় প্রোটনগুলো একত্রিত হয়ে হিলিয়াম তৈরি করে, যার ফলে প্রচুর তাপ ও গামা রশ্মি (ফোটন) উৎপন্ন হয়। সূর্যের কেন্দ্রের ঘনত্ব পানির চেয়ে ১৫০ গুণ বেশি হওয়ায় ফোটনগুলো সোজা পথে চলতে পারে না। বরং এগুলো পরমাণু ও আয়নিত গ্যাসের সাথে ক্রমাগত ধাক্কা খেয়ে আঁকাবাঁকা বা জিগজ্যাগ পথে সামনে এগোতে থাকে।
এই যাত্রাপথে ফোটনকে প্রথমে অতিক্রম করতে হয় 'রেডিয়েটিভ জোন' বা বিকিরণ অঞ্চল, যা সূর্যের ব্যাসার্ধের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই অঞ্চলের চরম ঘনত্বের কারণে ফোটনগুলো বারবার বিক্ষিপ্ত হয় এবং শোষিত হয়ে এক্স-রে বা অতিবেগুনি রশ্মিতে পরিণত হয়। এরপর ফোটনগুলো পৌঁছায় 'কনভেকশন জোন' বা পরিচলন অঞ্চলে, যেখানে ঘনত্ব কিছুটা কম থাকায় গতি কিছুটা বাড়ে এবং প্রায় ১০ দিনের মধ্যে সূর্যপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে সূর্যের কেন্দ্র থেকে পৃষ্ঠতলে পৌঁছাতে একটি ফোটনের ৩০ হাজার বছর থেকে শুরু করে কয়েক মিলিয়ন বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। একবার পৃষ্ঠতলে পৌঁছানোর পর পৃথিবীতে আসতে তার সময় লাগে মাত্র সাড়ে আট মিনিট। এর অর্থ হলো, আমরা বর্তমানে যে সূর্যালোক দেখছি, তা অন্তত ৩০ হাজার বছর আগে বা শেষ বরফ যুগের সময় সূর্যের অভ্যন্তরে উৎপন্ন হয়েছিল। আর আজ সূর্যের কেন্দ্রে যে আলোর জন্ম হলো, তা পৃথিবীতে পৌঁছাতে আরও কয়েক হাজার বছর সময় নেবে।




