পর্দার সামনে তিনি ছিলেন একজন কঠোর ও রাগী গৃহকর্তা, যাঁর একটি থাপ্পড়ে কেঁপে উঠত বাড়ির সবাই। কিন্তু ক্যামেরার আলো নিভে গেলেই বেরিয়ে আসত তাঁর আসল রূপ—এক পরম স্নেহশীল ও কোমল হৃদয়ের মানুষ। আজ ৬ নভেম্বর, বরেণ্য অভিনেতা আলী যাকেরের ৮২তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর অনুজ সহশিল্পী ফারুক আহমেদের স্মৃতিতে এই মানুষটির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।

ফারুক আহমেদের অভিনয়জীবনের শুরু হয়েছিল ‘আজ রবিবার’ নাটকের মাধ্যমে, যেখানে তিনি মতির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এবং আলী যাকের ছিলেন বাড়ির বড় ছেলে আজগর। নাটকের কাহিনীতে আজগরের চরিত্রে আলী যাকেরকে দেখা যেত গম্ভীর ও কঠোর হিসেবে, যিনি দরজায় উঁকি দেওয়া মতির ওপর প্রায়ই রাগ দেখাতেন। ফারুক আহমেদ recalls করেন, দৃশ্যটি বাস্তবসম্মত করতে আলী যাকের তাঁকে সত্যিই বেশ কয়েকবার থাপ্পড় মেরেছিলেন। তবে প্রতিবার শট শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তিনি ফারুককে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বলতেন, “ইশ্ রে, জোরে লেগেছে মনে হয়। মনে কষ্ট রেখো না।”

এমনকি হুমায়ূন আহমেদের ‘অচিন বৃক্ষ’ নাটকে যখন ফারুককে আরও একবার থাপ্পড় মারার দৃশ্য ছিল, তখন আলী যাকেরের মন সায় দিচ্ছিল না। ফারুকের মায়াবী চেহারার কথা ভেবে তিনি পরিচালক হুমায়ূন আহমেদকে অনুরোধ করেন দৃশ্যটি পরিবর্তন করতে। শেষ পর্যন্ত ক্যামেরার কৌশলে শুধু থাপ্পড়ের শব্দ শোনানো হয়, যা গল্পের প্রয়োজন মেটালেও ফারুকের কষ্ট দূর করে। প্রায় ১৫টি নাটকে একসঙ্গে কাজ করা ফারুকের মতে, আলী যাকের ছিলেন অত্যন্ত নিরহংকার এবং সহযোগিতাপূর্ণ একজন মানুষ, যিনি সেটে সবার মূল্যায়ন করতেন।

১৯৪৪ সালের ৬ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার রতনপুরে জন্ম নেওয়া আলী যাকেরের জীবন ছিল বহুমুখী। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইংরেজি বিভাগে কাজ করে আন্তর্জাতিক মহলে মুক্তিসংগ্রামের খবর পৌঁছে দিয়ে একজন ‘শব্দসৈনিক’ হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকের মাধ্যমে তাঁর মঞ্চযাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি অভিনয়, নির্দেশনা ও সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর স্ত্রী সারা যাকের ছিলেন এই দীর্ঘ পথচলার সহযাত্রী।

মঞ্চে তাঁর অভিনয়শৈলী ছিল অনন্য। সৈয়দ শামসুল হকের ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এ নূরলদীন, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্‌সা’য় দেওয়ান গাজী এবং ‘গ্যালিলিও’ নাটকের নাম ভূমিকায় তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। পাশাপাশি ‘ম্যাকবেথ’ ও ‘অচলায়তন’-এর মতো নাটকেও তিনি বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছেন। টেলিভিশনেও তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়; বিশেষ করে ‘আজ রবিবার’ ও ‘বহুব্রীহি’র মাধ্যমে তিনি কোটি দর্শকের প্রিয় হয়ে ওঠেন।

অভিনয়ের বাইরেও আলী যাকের ছিলেন একজন দক্ষ আলোকচিত্রী ও লেখক। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সদস্য হিসেবে তিনি প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনের ছবি তুলেছেন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি হিসেবে তিনি যুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

শিল্পকলার প্রতি তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার এবং মুনীর চৌধুরী পদকসহ নানা সম্মাননায় ভূষিত হন। দীর্ঘ ক্যানসার লড়াই এবং শেষে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর ৭৬ বছর বয়সে এই মহান শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর চলে যাওয়াতে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন এক অপূরণীয় ক্ষতি বরণ করে, তবে তাঁর কাজ ও ব্যক্তিত্ব আজও অনুপ্রেরণা হয়ে রয়ে গেছে।