বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এবং প্রতিভাবান অভিনেত্রী এমা স্টোন, যাঁর প্রকৃত নাম এমিলি জিন স্টোন। ১৯৮৮ সালের ৬ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার স্কটসডেলে জন্ম তাঁর। নির্মাণ ব্যবসায়ী বাবা জেফরি স্টোন এবং গৃহিণী মা ক্রিস্টা স্টোনের একমাত্র কন্যা হিসেবে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। ছোট ভাই স্পেন্সারের সঙ্গে শৈশব কাটানো এমার অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক ছিল শুরু থেকেই। মাত্র ১১ বছর বয়সে ‘দ্য উইন্ড ইন দ্য উইলোস’ নাটকের মাধ্যমে মঞ্চে তাঁর অভিষেক ঘটে। এরপর স্থানীয় ভ্যালি ইয়ুথ থিয়েটারে বিভিন্ন নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি ইমপ্রোভাইজেশন কমেডির চর্চা চালিয়ে যান তিনি।

তবে স্থানীয় মঞ্চের সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে হলিউডে কাজ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর। এই স্বপ্ন পূরণে তিনি তাঁর বাবা-মায়ের সামনে ‘প্রজেক্ট হলিউড’ নামের একটি পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন, যেখানে লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে অভিনয়ের চেষ্টা করার বিস্তারিত পরিকল্পনা ছিল। ম্যাডোনার ‘হলিউড’ গানটি ব্যবহার করে তৈরি করা এই অভিনব উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বপ্নকে সমর্থন করেন বাবা-মা। ২০০৪ সালে ১৫ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলেসে পাড়ি জমান এমা। প্রচলিত স্কুল ছেড়ে অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অডিশন দিতে শুরু করেন তিনি। তবে শুরুর দিনগুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন। ডিজনি চ্যানেলসহ বিভিন্ন টেলিভিশন প্রোগ্রামের অডিশন দিলেও দীর্ঘ সময় কোনো কাজ পাননি তিনি। এমনকি সংসার চালাতে এবং ব্যক্তিগত খরচ মেটাতে তাঁকে ছোটখাটো কাজও করতে হয়েছে। সিবিএস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানান, অডিশনের প্রক্রিয়াটি তাঁর কাছে কখনো চাকরির ইন্টারভিউ, কখনো প্রথম ডেট, আবার কখনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মতো যন্ত্রণাদায়ক মনে হতো।

২০০৪ সালে ‘ইন সার্চ অব দ্য নিউ পার্ট্রিজ ফ্যামিলি’ রিয়েলিটি প্রতিযোগিতায় লরি পার্ট্রিজ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রথম পরিচিতি পান তিনি। যদিও ওই শো-টি পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়নি, তবে সেখান থেকেই তাঁর দীর্ঘদিনের ম্যানেজার ডগ ওয়াল্ডের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর ‘ম্যালকম ইন দ্য মিডল’ এবং ‘মিডিয়াম’-এর মতো টিভি শো-তে ছোট চরিত্রে অভিনয় করে ২০০৭ সালে ‘সুপারব্যাড’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় প্রবেশ করেন। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের প্রকৃত মোড় ঘোরে ২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কমেডি সিনেমা ‘ইজি এ’-র মাধ্যমে। অলিভ পেন্ডারগাস্ট চরিত্রে তাঁর অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি প্রথমবারের মতো গোল্ডেন গ্লোব মনোনয়ন পান। এর পর ‘দ্য হেল্প’ এবং ‘ক্রেজি, স্টুপিড, লাভ’ সিনেমায় তাঁর দক্ষতা আরও প্রমাণিত হয়।

বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা আসে ২০১২ সালে ‘দ্য অ্যামেজিং স্পাইডার-ম্যান’ সিনেমায় গুয়েন স্টেসি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। অ্যান্ড্রু গারফিল্ডের সঙ্গে তাঁর পর্দার রসায়ন দর্শক মনে গেঁথে থাকে। ২০১৪ সালে ‘বার্ডম্যান’ সিনেমার জন্য প্রথমবার অস্কার মনোনয়ন পেলেও, চূড়ান্ত সাফল্য আসে ২০১৬ সালে ড্যামিয়েন শ্যাজেলের ‘লা লা ল্যান্ড’-এর মাধ্যমে। মিয়া ডোলান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব এবং বাফটা সহ অসংখ্য পুরস্কার জয় করেন। এই ছবির সাফল্যের পর ২০১৭ সালে ফোর্বসের তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রীদের শীর্ষে পৌঁছান তিনি, যার পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। পরবর্তীতে ‘ব্যাটল অব দ্য সেক্সেস’ এবং ‘দ্য ফেভারিট’ সিনেমার মাধ্যমে নিজের অভিনয় প্রতিভাকে আরও সমৃদ্ধ করেন। ২০২১ সালে ‘ক্রুয়েলা’র নামভূমিকায় অভিনয় করে তিনি নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘পুওর থিংস’ সিনেমায় বেলা ব্যাক্সটার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০২৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো অস্কার জয় করেন তিনি। ২০২৬ সালে ‘বুগোনিয়া’ সিনেমার জন্য পুনরায় সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়ন পান তিনি, যা তাঁর অভিনয় জীবনের অন্যতম মাইলফলক। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা ক্ষেত্রেও সফল হয়েছেন এমা। ২০২০ সালে স্বামী ডেভ ম্যাককারির সঙ্গে ‘ফ্রুট ট্রি’ নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা এ২৪-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। এর আওতায় ‘বুগোনিয়া’ সহ বেশ কিছু কাজ মুক্তি পেয়েছে।

আর্থিক অবস্থার কথা বলতে গেলে, সেলিব্রিটি নেট ওয়ার্থের ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী এমা স্টোনের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৩২ কোটি টাকা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি প্রথমে অ্যান্ড্রু গারফিল্ডের সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন, তবে ২০১৫ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে লেখক ও পরিচালক ডেভ ম্যাককারির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং ২০১৯ সালে বাগদান সম্পন্ন হয়। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ২০২১ সালে তাঁদের কন্যাসন্তান লুইস জ্যাঁ ম্যাককারি জন্ম নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব একটা সক্রিয় না থেকে তিনি নিজের পরিবার এবং কাজকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।