বাংলা সিনেমার ইতিহাসে যার নাম অনিবার্য, সেই বরেণ্য অভিনেতা আনোয়ার হোসেন আজ চলচ্চিত্র অঙ্গনের কাছে প্রায় বিস্মৃত। ১৯৩১ সালের ৬ নভেম্বর জামালপুরের মুরুলিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা এ কে এম নাজির হোসেন ছিলেন জেলা সাব-রেজিস্ট্রার। ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহী আনোয়ার হোসেন ১৯৪১ সালে দেওয়ানগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে পড়ালেখার পাশাপাশি অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক তৈরি করেন। পরবর্তীতে জামালপুর হাইস্কুল ও ময়মনসিংহ কলেজে পড়াশোনা করার সময় নাটকের প্রতি তাঁর আকর্ষণ প্রবল হয়। বিশেষ করে কলেজের প্রথম বর্ষে আসকার ইবনে শাইখের ‘পদক্ষেপ’ নাটকে অভিনয়ের পর থেকে তিনি অভিনয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে যান।

পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি আবদুল্লাহ খানের ‘সেলকন ইঞ্জিনিয়ারিং’ ফার্মে সুপারভাইজার হিসেবে ঢাকায় যোগ দেন। তবে অভিনয়ের টান তাঁকে টেনে নেয় মঞ্চের দিকে। ১৯৫৯ সালে ননী দাসের পরিচালনায় ‘এক টুকরো জমি’ এবং ঢাকা বেতারে ‘হাতেম তাই’ নাটকের মাধ্যমে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। আব্দুল জব্বার খান ও হাবিবুর রহমানের মতো গুণী শিল্পীদের সাথে পরিচয় এবং আসিরুদ্দিনের সহযোগিতায় মিনার্ভা থিয়েটার গঠনের মাধ্যমে তাঁর অভিনয় জীবন আরও সমৃদ্ধ হয়। এই থিয়েটারে সৈয়দ হাসান ইমাম ও সুভাষ দত্তর মতো অনেক মেধাবী শিল্পী যুক্ত ছিলেন।

১৯৬১ সালে মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ ছবিতে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি পরিচিতি পান, আর সালাহউদ্দিনের ‘সূর্যস্নান’ ছবিতে সুযোগ পান প্রধান চরিত্রে। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত আসে ১৯৬৭ সালে, যখন ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিতে নবাবের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সিরাজের দেশপ্রেম ও যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ দর্শকদের মনে গভীর দাগ কাটে। এরপর দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে তিনি প্রায় ৩৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক, ফ্যান্টাসি ও পারিবারিক মেলোড্রামা—সব ধরনের চরিত্রে তিনি সমান সাবলীল ছিলেন। ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘জয় বাংলা’, ‘লাঠিয়াল’, ‘পালঙ্ক’ এবং ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’-র মতো কালজয়ী ছবিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। জহির রায়হান, চাষী নজরুল ইসলাম ও কাজী হায়াতের মতো প্রথিতযশা পরিচালকদের সাথে কাজ করেছেন তিনি।

কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি নিগার পুরস্কার, ১৯৮৫ সালে একুশে পদক এবং দুবার বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা প্রদান করে। তবে জীবনের শেষ সময়ে তিনি শারীরিক অসুস্থতা ও বার্ধক্যের কারণে অভিনয় থেকে দূরে সরে যান। ২০০৬ সালে কাজী মোরশেদের ‘ঘানি’ ছিল তাঁর শেষ কাজ। ২০১০ সালে সম্মাননা পাওয়ার পর তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর একমাত্র কষ্ট হলো অসুস্থতার কারণে অভিনয় করতে না পারা। ২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ওই মাসের ১৩ সেপ্টেম্বর ৮২ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দুঃখজনকভাবে, তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে শিল্পী সমিতি বা চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন না হওয়ায় এবং নীরবতা বজায় থাকায় তাঁর অনুরাগী ও সমালোচকদের মনে প্রশ্ন জেগেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু আলোচনা চললেও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে তাঁকে যথাযথভাবে স্মরণ করা হয়নি।