কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেছেন ‘মেঘের পরে মেঘ’ নামের একটি চলচ্চিত্র, যার মূল ভিত্তি বরেণ্য কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের জীবনভিত্তিক বাস্তব কাহিনি। এই সিনেমাটিতে কেবল মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের চিত্রই ফুটে ওঠেনি, বরং স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দেশ ও সমাজের যে নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে, তার এক মর্মস্পর্শী দলিল হিসেবে এটি উপস্থাপিত হয়েছে। পরিচালক ও লেখক—উভয়ই মুক্তিযুদ্ধকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তাই চলচ্চিত্রের প্রতিটি দৃশ্যে সেই সময়ের প্রকৃত যন্ত্রণা ও বাস্তব সত্যের প্রতিফলন ঘটেছে।

চলচ্চিত্রটির কাহিনীতে দেখানো হয়েছে কীভাবে পাকিস্তানি বর্বর সেনারা দেশীয় রাজাকার, আল বদর এবং আল শামসদের সহযোগিতায় সাধারণ মানুষের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল। মজিদ নামের এক যুবকের ধার্মিক বাবার মৃত্যু, মায়ের অন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কিশোরী বোনের ধর্ষণের মতো নৃশংস ঘটনাগুলো এখানে উঠে এসেছে। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ সময়ে জীবন বাঁচাতে নারীদের যে লড়াই করতে হয়েছে, তার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে মজিদের নতুন বউ সুরাইয়ার লুকিয়ে থাকার দৃশ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালক দেখিয়েছেন, স্বাধীনতার পর অনেক ঘাতক দালাল কীভাবে নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং প্রকৃত বীরদের অবমাননা করে তাঁদের ষড়যন্ত্রের জালে জড়മാക്കിছে। এই সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈপরীত্য বর্তমান সময়েও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

অভিনয়ের দিক থেকে চলচ্চিত্রটি সমৃদ্ধ। মজিদ এবং সেজানের দ্বৈত চরিত্রে রিয়াজ তার দক্ষ অভিনয়ের মাধ্যমে দুটি ভিন্ন মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে, সুরাইয়া চরিত্রে পূর্ণিমা তার রূপ ও অভিনয়ের সংমিশ্রণে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছেন, যদিও বৃদ্ধ বয়সের রূপসজ্জায় সামান্য সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা গেছে। সিনেমাটিতে আরও অভিনয় করেছেন প্রবীর মিত্র, শহিদুল আলম সাচ্চু, এ কে এম জাহাঙ্গীর খান, জামিলুর রহমান শাখা এবং খালেদা আক্তার কল্পনার মতো গুণী শিল্পীরা।

কারিগরি দিক থেকেও চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত নিপুণ। ওয়াকিল আহমেদ ও জ্যোৎস্না কাজীর চিত্রনাট্য এবং রাবেয়া খাতুন ও ওয়াকিল আহমেদের সংলাপে বাস্তবতার ছোঁয়া রয়েছে। ইমন সাহার সংগীত এবং উত্তম গুহের শিল্পনির্দেশনা দর্শককে এক মায়াবী জগতের অনুভূতি দেয়। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা গানগুলোতে সুবীর নন্দী ও সাদী মোহাম্মদের কণ্ঠ নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত হলেও এই চলচ্চিত্রে নারীজীবনের এক বিশেষ যন্ত্রণার দিকটি আলোচিত হয়েছে। বিশেষ করে, নির্যাতনের শিকার নারীর গর্ভজাত সন্তান কার—এই প্রশ্নটি তোলা হয়েছে, যা পুরুষশাসিত সমাজের নিষ্ঠুর মাপকাঠি এবং নারীর ব্যক্তিত্বের লাঞ্ছনার প্রতীক। ২০০৪ সালে এই বিষয় নিয়ে চিন্তা করা লেখক ও পরিচালক, যা বর্তমান সময়েও অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং প্রাসঙ্গিক। সাংবাদিক ফরিদুর রেজা সাগরের সহযোগিতায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি দর্শকদের চোখে জল এনে দেওয়ার মতো এক করুণ অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।