বঙ্গোপসাগরের বুকে প্রবালসমৃদ্ধ সেন্ট মার্টিন দ্বীপ তার সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত হলেও, এই দ্বীপের শিক্ষাব্যবস্থা নাজুক অবস্থায় রয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, লেখাপড়ার উপযোগী বয়সের প্রায় ৪ হাজার শিশুর মধ্যে মাত্র ৭২৯ জন বিদ্যালয়মুখী। বাকি ৩ হাজারের বেশি শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে মাছ ধরা ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত রয়েছে।
গত ৮ ও ৯ আগস্ট দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, জেটির পূর্ব পাশের সৈকতে খেলাধুলায় মগ্ন ৩৫ জন শিশুর মধ্যে মাত্র ২ জন স্কুলে যায়। ১৪ বছর বয়সী মো. আলম জানায়, স্কুলে শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস হয় না, তাই স্কুলে যাওয়ার কোনো আগ্রহ নেই তার। অপর একদল শিশুর মধ্যে ১৩ জনের ৯ জনই স্কুলে যায় না। সাজেদা নামের এক শিশু জানায়, সে মক্তবে পড়ে, স্কুলে যায় না।
নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত পর্যটন মৌসুমে শিশুদের বেশিরভাগই কাজে লেগে যায়। পর্যটকদের ব্যাগ বহন, গাইডের কাজ, ডাব বিক্রি কিংবা মাছ ধরার মতো কাজে জড়িয়ে পড়ে তারা। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়া জানান, বছরের ৯ মাস নৌপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দ্বীপের শিক্ষা কার্যক্রম তদারকি করা প্রায় অসম্ভব। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা মাসে ২০০-২৫০ টাকা উপবৃত্তি পেলেও একদিন পর্যটকদের ব্যাগ টানলে ৫০০ টাকা পায়, যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় সাক্ষরতার হার ৫৫ শতাংশ হলেও সেন্ট মার্টিনে তা মাত্র ১৫ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ঝরে পড়ার হার ৩০ শতাংশ।
দ্বীপের একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘জিনজিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’য়ে সাতটি পদের মধ্যে মাত্র দুইজন শিক্ষক কর্মরত আছেন। প্রায় ১৪ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকসহ পাঁচটি পদ শূন্য রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ তাহের জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে মানসম্মত পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না। টেকনাফ উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আবু নোমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, দুর্গম দ্বীপে শিক্ষকদের যেতে অনীহার কারণে সংকট কাটছে না। তবে আগামী অক্টোবরের মধ্যে নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে।
কোনাপাড়ায় অবস্থিত বেসরকারি ‘ক্রিড প্রাথমিক বিদ্যালয়’ও তীব্র সংকটের মুখে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছে না। বর্তমানে মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে দুই শিফটে ৬৬ জন শিশুকে পাঠদান করানো হচ্ছে। শিক্ষক মো. এরফান জানান, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক বেতন নিয়ে কোনো রকমে বিদ্যালয় চালানো হচ্ছে, কিন্তু তহবিল সংকটের কারণে শিক্ষক নিয়োগ সম্ভব হচ্ছে না।
দক্ষিণ পাড়ায় অবস্থিত আরেকটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন মাত্র একজন শিক্ষক। এই শিক্ষকও প্রায় তিন মাস ধরে অনুপস্থিত থাকায় পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী শওকত আরাকে দিয়ে অন্যদের পড়ানো হচ্ছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য নজির আহমদ জানান, তহবিল সংকটের কারণে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।
দ্বীপের একমাত্র উচ্চমাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান সেন্ট মার্টিন বিএন ইসলামিক স্কুল অ্যান্ড কলেজেও শিক্ষক সংকট রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ১৩ জন শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ২ জন প্রাতিষ্ঠানিক বেতনে নিয়োগপ্রাপ্ত। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ৪৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১৩ জন। প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মদন কান্তি রুদ্র জানান, বর্ষা ও পর্যটন মৌসুমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায় এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। টেকনাফ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্লাহ জানান, যাতায়াত সমস্যার কারণে সশরীরে তদারকি করা যায় না, তবে ফলাফলের বিপর্য�় ও অনুপস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।




