শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য কায়সার কামাল। তাঁর নির্বাচনী এলাকার দুই উপজেলা—কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী ব্যক্তি আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি পদে থাকতে পারবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

গত রবিবার দুর্গাপুর উপজেলা মিলনায়তনে উপজেলা শিক্ষক সমিতি আয়োজিত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কায়সার কামাল এই অবস্থানের কথা প্রথম প্রকাশ করেন। এরপর সোমবার দুপুরে কলমাকান্দা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায়ও তিনি একই বার্তা পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, পরিচালনা কমিটির হাতে থাকা ক্ষমতার রাজনৈতিক অপব্যবহার অনেক সময় লক্ষ্য করা যায়। তাই সক্রিয় রাজনীতিকদের বদলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি এবং সমাজের সম্মানিত নিরপেক্ষ নাগরিকদের এসব কমিটিতে যুক্ত করা প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

“যারা রাজনীতি করতে চান, তাদের জন্য ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড কমিটি রয়েছে। তাই আমার নির্বাচনী এলাকায় রাজনৈতিক পদ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হওয়া যাবে না,”—বলেন কায়সার কামাল। এই নীতির আলোকে কেউ দলীয় পদ ছেড়ে দিলে তবেই তিনি সভাপতি হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবেন।

দুই উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় ৬টি বেসরকারি কলেজ, ৬টি কারিগরি কলেজ, ৫৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ১৫টি মাদ্রাসা রয়েছে। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অতীতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সভাপতি পদে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আধিপত্য থাকার প্রবণতা ছিল। ডেপুটি স্পিকারের উদ্যোগের ফলে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে দুর্গাপুরের বারোমারি উচ্চবিদ্যালয়, কাকৈইগড়া উচ্চবিদ্যালয়, কৃষ্ণের চর উচ্চবিদ্যালয় এবং কলমাকান্দা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়সহ অন্তত ১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পরিচালনা কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় শিক্ষাবিদরা। নেত্রকোনা সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও কলমাকান্দার বাসিন্দা ননী গোপাল সরকার মনে করেন, এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। তাঁর মতে, পরিচালনা কমিটিতে অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিরা থাকলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় পেশাদারত্ব বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষকরা যাতে নির্বিঘ্নে পাঠদান করতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ রাজনৈতিক কারণে ব্যাহত না হয়, সে জন্য এমন উদ্যোগ অপরিহার্য।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এবং একাডেমিক উন্নয়নে সভাপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ডেপুটি স্পিকারের এ উদ্যোগকে প্রশংসনীয় উল্লেখ করে বলেন, কমিটিতে শিক্ষাবিদ বা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা থাকলে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও মনিটরিংয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

এ প্রসঙ্গে কায়সার কামাল বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রভাবের স্থান হতে পারে না। শিক্ষার মান উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, যিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকবেন, তিনি রাজনীতি করবেন; কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আসতে হলে তাকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে।