বর্তমান সময়ে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এখন বাস্তব প্রয়োগের দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে গবেষণার কাজ বা খসড়া তৈরির মতো প্রক্রিয়াগুলো এখন অনেক দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে; যা আগে করতে মাসখানেক সময় লাগত, তা এখন মাত্র কয়েক দিনে বা কয়েক মিনিটে সম্ভব হচ্ছে। তবে মাইক্রোসফটের ভাইস প্রেসিডেন্টের মতে, শুধুমাত্র উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি মানেই ব্যবসায়িক রূপান্তর নয়। ম্যাককিন্সির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এআই এজেন্ট নিয়ে পরীক্ষা করলেও মাত্র ৩৯ শতাংশের আয়ের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে, গার্টনারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ৪০ শতাংশ এজেন্টিক এআই প্রকল্প বাতিল হয়ে যেতে পারে।

এই স্থবিরতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে কাজের প্রচলিত ধারা। দীর্ঘ সময় ধরে এন্টারপ্রাইজ ওয়ার্কফ্লো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেখানে মানুষ বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনের মধ্যে তথ্যের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। সিআরএম (CRM), ইআরপি (ERP) বা প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মতো সফটওয়্যারগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে, একজন মানুষকে ম্যানুয়ালি বিভিন্ন ইন্টারফেসের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান করতে হয়। একে লেখক 'টগল ট্যাক্স' হিসেবে অভিহিত করেছেন। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন কর্মী দিনে গড়ে প্রায় ১,২০০ বার বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনের মধ্যে সুইচ করেন, যার ফলে কাজের সপ্তাহের প্রায় ৯ শতাংশ সময় শুধুমাত্র পুনরায় খাপ খাইয়ে নিতে ব্যয় হয়।

এই পরিস্থিতি কিছু মানুষের মনে 'সাস-পোক্যালিপস' বা সাস-এর বিলুপ্তির আশঙ্কা তৈরি করেছে। তাদের যুক্তি হলো, এআই এজেন্ট যদি সরাসরি ডেটা অ্যাক্সেস করতে পারে, তবে আলাদা অ্যাপের আর প্রয়োজন কী? তবে মাইক্রোসফটের এই কর্মকর্তার মতে, প্রশ্নটি হওয়া উচিত অ্যাপগুলো ভবিষ্যতে কী রূপে পরিবর্তিত হবে। তাঁর মতে, এআই-চালিত বিশ্বে মানুষ আর অ্যাপে লগ-ইন করে নেভিগেট করবে না; বরং সাস হয়ে উঠবে এমন এক সিস্টেম যা এআই এজেন্টদের নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট (Context) প্রদান করবে। অ্যাপগুলোর প্রকৃত মূল্য কখনোই তাদের ইন্টারফেসে ছিল না, বরং তা ছিল এর ভেতরে থাকা ডেটা, ব্যবসায়িক নিয়ম, শাসনকাঠামো এবং লজিকের মধ্যে।

গার্টনারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যেখানে ১ শতাংশের কম এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যারে এজেন্টিক এআই ছিল, ২০২৮ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৩৩ শতাংশ হবে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধুমাত্র প্রযুক্তি বসিয়ে দিলেই হবে না, কাজের প্রক্রিয়াকেও নতুন করে সাজাতে হবে। মাইক্রোসফটের 'ওয়ার্ক ট্রেন্ড ইনডেক্স' অনুযায়ী, মাত্র চারজন কর্মীর মধ্যে একজন মনে করেন যে এআই নিয়ে তাদের নেতৃত্বের মধ্যে সঠিক সমন্বয় রয়েছে। প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে হলে প্রতিষ্ঠানের একটি অভিন্ন লক্ষ্য থাকা এবং সেই অনুযায়ী কাজের প্রক্রিয়ার পুনর্গঠন করা জরুরি।

নেতৃবৃন্দের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে, রাতারাতি পুরো ব্যবসা বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং একাধিক অ্যাপ্লিকেশনের সমন্বয়ে গঠিত এমন একটি ওয়ার্কফ্লো দিয়ে শুরু করা উচিত যার ব্যবসায়িক মূল্য স্পষ্ট। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ধীরে ধীরে তা সম্প্রসারণ করতে হবে। যখন মানুষ তথ্যের বাহক বা 'হিউম্যান গ্লু' হওয়ার ভূমিকা থেকে বেরিয়ে আসবে, তখন তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পর্ক স্থাপন এবং ব্যবসাকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার মতো সৃজনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেশি সময় দিতে পারবে।