সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর অভিভাবকরা চরম মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যান, তবে এই সময়ে মাথা ঠান্ডা রাখা এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা জানান, শিশু নিখোঁজ হওয়ার প্রথম এক ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যাকে বলা হয় 'গোল্ডেন আওয়ার'। এই সময়ের মধ্যে শিশুটি ওই এলাকাতেই থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে, তাই প্রতি সেকেন্ডের হিসাব রাখা প্রয়োজন। আতঙ্কিত হয়ে সময় নষ্ট না করে পরিকল্পিতভাবে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
প্রথমত, দ্রুত আশপাশের সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ শুরু করতে হবে। শিশুটিকে সর্বশেষ কোথায়, কখন এবং কার সঙ্গে দেখা গেছে তা নিশ্চিত করে বাড়ি, ছাদ, গলি, দোকান, পার্ক, স্কুল বা বাসস্ট্যান্ডের মতো জায়গায় অনুসন্ধান চালাতে হবে। এই কাজে পরিবারের সদস্য ও পরিচিতদের বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে দ্রুত তল্লাশি চালানো কার্যকর।
দ্বিতীয়ত, শিশুটি নিজে ফিরে আসবে বলে অপেক্ষা না করে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানাতে হবে। নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করার পাশাপাশি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করা উচিত। যত দ্রুত পুলিশকে জানানো হবে, অনুসন্ধান প্রক্রিয়া তত দ্রুত শুরু হবে এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে শিশুকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
তৃতীয়ত, পুলিশের কাছে শিশুর সঠিক তথ্য প্রদান করতে হবে। শিশুর সাম্প্রতিক পরিষ্কার ছবি, নাম, বয়স, উচ্চতা, গায়ের রং, পরনের পোশাক ও জুতার বিবরণ এবং কোনো বিশেষ শারীরিক চিহ্ন থাকলে তা জানাতে হবে। পাশাপাশি নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি করতে হবে। শিশুর কাছে মোবাইল ফোন থাকলে তার শেষ অবস্থান বা ডিজিটাল তথ্যগুলো মুছে ফেলবেন না, কারণ তা তদন্তে সহায়ক হতে পারে।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্কতার সঙ্গে খবর ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে পূর্ণ ঠিকানা বা জন্মনিবন্ধন নম্বরের মতো ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য প্রকাশ না করে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তথ্য এবং ছবি সংশ্লিষ্ট এলাকার গ্রুপগুলোতে শেয়ার করা উচিত। এছাড়া মূল সড়কের মোড়, নিকটস্থ হাসপাতাল, ক্লিনিক, রেলস্টেশন বা লঞ্চঘাটে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন।
শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং 'অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশ' যৌথভাবে 'মুন অ্যালার্ট' (মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন) নামক বিশেষ সেবা চালু করেছে। ২০২৪ সালে সিলেটে নিহত শিশু মুনতাহার স্মরণে এই সিস্টেমের নামকরণ করা হয়েছে। নিখোঁজ শিশুর তথ্য জানাতে সিআইডির টোল ফ্রি নম্বর ১৩২১৯ অথবা munalert.org ওয়েবসাইটে যোগাযোগ করা যাবে। সিআইডি নিখোঁজ হওয়ার পরবর্তী তিন ঘণ্টাকে 'গোল্ডেন টাইম' হিসেবে বিবেচনা করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়। এই সতর্কবার্তা ডিজিটাল বিলবোর্ড, এটিএম বুথ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে প্রচার করা হয়।
উল্লেখ্য, পুলিশ সদর দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ২ হাজার ৩৮ জনের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজ শিশুদের প্রায় ১৩ শতাংশ এখনো নিখোঁজ। তবে তারা আশ্বস্ত করেছে যে, সব নিখোঁজ ঘটনা অপহরণ বা পাচার নয়; অনেক ক্ষেত্রে পথ হারানো বা ঠিকানা বলতে না পারার কারণেও শিশুরা নিখোঁজ হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে।




