বয়স বাড়ার সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের মাঝে এক নীরব কিন্তু মারাত্মক সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় ‘ডিমেনশা’ বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি কেবল সাধারণ কোনো ভুলে যাওয়ার প্রবণতা নয়, বরং এটি মস্তিস্কের একটি দীর্ঘমেয়াদি অবক্ষয়। এর ফলে মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, যৌক্তিক চিন্তা, সাধারণ হিসাব-নিকাশ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের স্নায়বিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। অনেকের ধারণা বয়স বাড়লে এই রোগ হওয়া অনিবার্য, তবে আধুনিক নিউরোসায়েন্স বলছে এটি ভুল। সঠিক যত্ন এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে মস্তিস্কের নিউরনের ক্ষয় রুখে দিয়ে একে প্রখর রাখা সম্ভব।
মস্তিস্ককে তরুণ ও সচল রাখতে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পুষ্টিবিশেষজ্ঞরা ৬টি বিশেষ অভ্যাসের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া। মস্তিস্কের কার্যকারিতা সরাসরি শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার সাথে যুক্ত। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণ, রক্তচাপ এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত জরুরি। হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা সমাধান এবং অন্যের সাথে যোগাযোগ করার ক্ষমতা বজায় থাকে।
দ্বিতীয়ত, খাদ্যতালিকায় পুষ্টির সমন্বয়। মস্তিস্কের স্বাস্থ্যের জন্য ফল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য এবং বাদাম অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষ করে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ মাছ এবং বিভিন্ন রঙের সবজিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও খনিজ মস্তিস্কের কোষকে জারণজনিত ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্য-ধারা মস্তিস্কের জন্য বিশেষ উপকারী।
তৃতীয়ত, অন্ত্রের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া। শরীরতত্ত্ব অনুযায়ী অন্ত্র ও মস্তিস্কের মধ্যে একটি নিবিড় যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকে, যাকে ‘অন্ত্র-মস্তিষ্ক অক্ষ’ বলা হয়। অন্ত্রে উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য বজায় থাকলে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে, যা পরোক্ষভাবে মস্তিস্ককেও প্রভাবিত করতে পারে। এজন্য আঁশযুক্ত খাবার এবং দইয়ের মতো ফারমেন্টেড খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, যদিও এই বিষয়ে গবেষণা এখনও চলমান।
চতুর্থত, মস্তিস্ককে মানসিকভাবে সক্রিয় রাখা। নতুন কোনো ভাষা শেখা, বই পড়া, লেখালেখি করা বা বাদ্যযন্ত্র বাজানোর মতো বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ মস্তিস্কের স্নায়ু সংযোগকে শক্তিশালী করে। একে বলা হয় নিউরোপ্লাস্টিসিটি, যার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের ফলে মস্তিস্ক নতুন নতুন সংযোগ তৈরি করে। তাই বয়স নির্বিশেষে শেখার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম। হাঁটা, সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানোর মতো কায়িক শ্রম মস্তিস্কে রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে অক্সিজেন ও পুষ্টির সরবরাহ নিশ্চিত করে। এটি স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘক্ষণ বসে না থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী শরীরচর্চা করা মস্তিস্কের জন্য অপরিহার্য।
ষষ্ঠত, গভীর ও পর্যাপ্ত ঘুম। ঘুমের সময়ে মস্তিস্ক সারাদিনের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি সংহত করে এবং ক্ষতিকর বর্জ্য অপসারণ করে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের মান উন্নত করতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস করা এবং রাতে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার কমিয়ে আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা উচিত।
পুষ্টিবিদ লিনা আকতার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো জীবনযাপন পদ্ধতিই ডিমেনশাকে শতভাগ প্রতিরোধ করার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তবে ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তন— যেমন প্রতিদিন অল্প হাঁটা, শাকসবজি খাওয়া এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখে।




