১৯২৬ সালের মার্চ মাসে ফরিদপুর জেলার মাদারীপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এক ঐতিহাসিক ইভেন্ট— 'নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রাদেশিক মৎস্যজীবী সম্মেলন'। এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মাদারীপুরের মাটিতে পদার্পণ করেছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১০ই মার্চ সন্ধ্যায় স্টিমারযোগে যখন কবি নজরুলসহ অন্যান্য অতিথিরা মাদারীপুর ঘাটে পৌঁছান, তখন প্রায় পাঁচ হাজার উৎসুক মানুষের উপস্থিতিতে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। এই সম্মেলনের মূল আয়োজক এবং অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রথিতযশা নেতা ড. প্রতাপচন্দ্র গুহরায়, যিনি নিজেই এক সময় মাদারীপুরের বিপ্লবী সংগঠন 'শান্তি সেনা সমিতি'-র সদস্য ছিলেন এবং পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কমিটির সম্পাদক ছিলেন কার্তিকচন্দ্র মল্ল বর্মণ।

সম্মেলনের প্রথম দিনে, ১১ই মার্চ, কবি নজরুল ইসলাম তাঁর ৮৪ পঙ্ক্তির উদ্দীপনামূলক ‘জেলেদের গান’ পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। পরবর্তীতে ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থে এই গানটি ‘ধীবরদের গান’ শিরোনামে সংকলিত হয়। এই গানের মাধ্যমে নজরুল মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের ওপর ধনিক শ্রেণির শোষণ ও নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরেন এবং তাদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি মুটে-মজুর ও কৃষকদের উদাহরণ দিয়ে জেলেদের বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দেন।

দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে আসাম ও বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় পাঁচশ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে এক পর্যায়ে প্রতিনিধিদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই বিশৃঙ্খল মুহূর্তে কবি নজরুল স্বত:প্রেরণে হারমোনিয়াম নিয়ে গান গাইতে শুরু করেন, যা মুহূর্তের মধ্যেই পরিবেশকে শান্ত ও সুশৃঙ্খল করে তোলে। সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে হেমন্ত কুমার সরকার পুনর্নির্বাচিত সভাপতি এবং রমণী মোহন বিশ্বাস সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান।

মাদারীপুর সফরের তৃতীয় দিনে, ২৯শে ফাল্গুন (১৩৩২ বঙ্গাব্দ), কবি নজরুল অনুপ্রাণিত হয়ে কংগ্রেস নেত্রী হেমপ্রভা মজুমদারের ব্যক্তিত্ব ও দেশপ্রেমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘হেমপ্রভা’ গীতিকবিতাটি রচনা করেন। এখানে তিনি হেমপ্রভাকে পরাধীন বাংলার ‘আলোক-জননী’ এবং স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

কবির এই সফরের শতবর্ষ পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে বর্তমান সময়ে বিভিন্ন প্রস্তাবনা উঠে এসেছে। জেলা প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, মাদারীপুরের তৎকালীন স্টিমারঘাট বা সম্মেলনের স্থানে একটি স্মৃতিফলক বা ‘নজরুল স্মারক’ নির্মাণ করা প্রয়োজন। এছাড়া শহরের প্রধান কোনো সড়ক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নজরুলের নামে রাখা, পাবলিক লাইব্রেরিতে ‘নজরুল কর্নার’ স্থাপন এবং আড়িয়াল খাঁ নদের তীরে মৎস্যজীবীদের ইতিহাস ও নজরুলের সাম্যবাদী চেতনা ফুটিয়ে তুলতে ‘ধীবর মোড়’ বা ভাস্কর্য নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে তিন দিনব্যাপী শতবর্ষ উৎসবের আয়োজন এবং একটি উচ্চমানের স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের কথা বলা হয়েছে যাতে তরুণ প্রজন্মের কাছে নজরুলের এই ঐতিহাসিক সফরের কথা পৌঁছে যায়।