বর্তমান বিশ্বে সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য এক অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় পৌঁছেছে এবং মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে বলে মত দিয়েছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক কৌশিক বসু। বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘সৈয়দ হুমায়ুন কবীর স্মৃতি গবেষণা সম্মেলন ২০২৬’-এ মূল প্রবন্ধ পাঠ করে তিনি এই সতর্কবার্তা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এই অধ্যাপক ভার্চুয়ালি সম্মেলনে যোগ দেন।

অধ্যাপক কৌশিক বসু উল্লেখ করেন, বিশ্ব এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট, মেরুকরণ এবং সংঘাত প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রসারের ফলে প্রচলিত শ্রমের চাহিদা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ, ভারত এবং অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ শ্রমের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। ফলে শ্রমের চাহিদা কমে যাওয়া এই দেশগুলোর সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে। জিডিপির একটি বড় অংশ এখন মুনাফা এবং মেধাস্বত্বের মাধ্যমে অর্জিত হচ্ছে, অথচ শ্রমিকদের প্রাপ্য অংশ ক্রমাগত কমছে।

অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি একটি নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন তিনি, যাকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘কণ্ঠস্বরের বৈষম্য’ হিসেবে। অধ্যাপক বসহু জানান, আগে ধনীদের ক্ষমতা কেবল বিলাসদ্রব্য বা সম্পদ সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে তারা সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো জনমত গঠনের শক্তিশালী মাধ্যমগুলোর মালিকানা দখল করে নিচ্ছে। এর ফলে অর্থনৈতিক ক্ষমতা এখন মানুষের চিন্তাভাবনা ও মতপ্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে, যা সরাসরি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতের গ্রামপর্যায়ের গবেষণার কথা বলেন, যেখানে দেখা যায় অতি ধনীদের উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কথা বলার সাহস কমে যায়।

এই সংকট উত্তরণে তিনি ১৭৫০ থেকে ১৮৫০ সালের শিল্পবিপ্লবের সময়ের অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দেন। সেই সময়ে নতুন জ্ঞান, শক্তিশালী চিন্তাধারা এবং সামাজিক আন্দোলনের সমন্বিত শক্তির মাধ্যমেই শিশুশ্রম বন্ধ ও কর্মঘণ্টা কমানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় অধ্যাপক কৌশিক বসু জ্ঞান, নৈতিক চিন্তা, সক্রিয় গবেষণা এবং সামাজিক উদ্যোগকে একই আলোচনার টেবিলে আনার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, প্রকৃত উন্নয়ন বলতে আমরা কী বুঝি এবং আমাদের সামনে নীতিগত বিকল্পগুলো কী হতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে।

বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন ও সাজেদা ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ন্যায্যতা, সক্ষমতা ও জীবনকুশলতা’ শীর্ষক এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আহমেদ জাভেদ চৌধুরী এবং সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ফারুক সোবহান ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা উপদেষ্টা সাজেদা আমিন।