বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে কলকাতার সাহিত্য অঙ্গন ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। 'ছোটগল্প' পত্রিকার হাত ধরে তৎকালীন সময়ে দেবেশ রায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের মতো একঝাঁক প্রতিভাবান গল্পকারের আবির্ভাব ঘটে। এই সৃজনশীল পরিবেশের মধ্যেই আবির্ভূত হন কবি বিনয় মজুমদার। ফরিদপুরের সন্তান বিনয়, যার জন্ম হয়েছিল তৎকালীন বর্মা মুলুকে। ১৯৫৮ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'নক্ষত্রের আলোয়' প্রকাশিত হয়, যেখানে জীবনানন্দ দাশের প্রভাব স্পষ্ট ছিল। পরবর্তীতে 'ফিরে এসো চাকা' নামক এক রহস্যময় কাব্যগ্রন্থ বের হয়। কাব্যচর্চার পাশাপাশি রুশ ভাষা রপ্ত করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রুশ গ্রন্থের অনুবাদ করে তিনি পরিচিতি লাভ করেন।
প্রখ্যাত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় বিনয় মজুমদারের প্রতিভার কথা উল্লেখ করে তাঁকে একজন 'জাত-কবি' হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতে, বিনয় মজুমদারের কবিতা মঞ্চে পাঠের উপযোগী ছিল না, বরং তা ছিল নিভৃতে পড়ার মতো এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা। যদিও শুরুতে জীবনানন্দের প্রভাব থাকলেও, দ্রুতই বিনয় তাঁর নিজস্ব কাব্যশৈলী গড়ে তোলেন এবং গায়ত্রীর প্রতি উৎসর্গিত কবিতাসমূহ লেখেন, যা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। তবে বিনয় কখনোই সাহিত্যের মূলধারার মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি।
বিনয় মজুমদারের ব্যক্তিগত জীবন ছিল চরম অস্থিরতা ও মানসিক দ্বন্দ্বে ঘেরা। তাঁর বন্ধু বেলাল চৌধুরীর স্মৃতিচারণে জানা যায়, বিনয় কফি হাউসের নিয়মিত মুখ ছিলেন, তবে তিনি প্রায়ই অন্যমনস্ক হয়ে পড়তেন এবং অবচেতন মনে গান গাইতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে যেমন ছিল অন্তনঙ্গতা, তেমনই ছিল মাঝে মাঝে উগ্র আচরণ। জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত বিনয় একসময় জ্যোতির্ময় দত্তের আশ্রয় পান এবং বন্ডেল রোডের একটি ঘরে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তাঁর অবস্থান ছিল কিছুটা করুণ, যা তাঁর আচরণ ও পরিবেশ থেকে স্পষ্ট বোঝা যেত।
বিনয় মজুমদারের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এবং তাঁর অদ্ভুত সব বিশ্বাসের কথা উঠে এসেছে মীনাক্ষী দত্তের লেখায়। বিনয় মাঝেমধ্যে অপরিচিত নারীদের নিজের 'ঈশ্বরী' হিসেবে কল্পনা করতেন এবং তাঁদের প্রতি এক ধরনের অতিপ্রাকৃত ভক্তি পোষণ করতেন। এই মানসিক বিকারের কারণেই তিনি অদ্ভুত সব কথা বলতেন। যেমন, তাঁর দিনলিপিতে তিনি লিখেছিলেন যে তিনি পৃথিবীর সমস্ত মানবীকে বন্ধ্যা করে দিয়েছেন। তাঁর কবিতার খাতাগুলোও ছিল অদ্ভুত; সিল্ক বা তসরের ব্লাউজের টুকরো দিয়ে তিনি খাতা বাঁধাতেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, বিনয়ের ডায়েরি এবং কবিতা ছিল অভিন্ন। তাঁর অসুখী শৈশব এবং প্রবল মেধাবোধের মাঝে এক অদ্ভুত সংঘাত ছিল, যা ধীরে ধীরে তাঁর মানসিক ভারসাম্যকে পর্যুদস্ত করে ফেলেছিল। বিনয় মজুমদার নিজের জীবনকেই কবিতার সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর লেখা দিনলিপির একটি বাক্য তাঁর জীবনদর্শনকে সংক্ষেপে প্রকাশ করে— 'বেঁচে থাকা জিনিসটা খুব ভালো'। এভাবে এক ট্র্যাজিক জীবন এবং অনন্য কাব্যপ্রতিভার মধ্য দিয়ে বিনয় মজুমদার বাংলা সাহিত্যের এক প্রান্তিক অথচ স্মরণীয় নাম হয়ে আছেন।



