সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা সামনে এসেছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও গান এবং সংস্কৃতিচর্চাকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মনে করিয়ে দেয় ১৯২৬ সালে ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজের হাত ধরে শুরু হওয়া 'বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন'-এর কথা, যা এই বছর শতবর্ষে পদার্পণ করেছে।

আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব কাজী মোতাহার হোসেন তাঁর ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’ প্রবন্ধে তৎকালীন মুসলিম সমাজের আনন্দহীনতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে কঠোর নিয়মকানুনের বেড়াজালে পড়ে মুসলমানরা শিল্পকলা, গান বা বিনোদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল এবং পরকালের সান্ত্বনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। মোতাহার হোসেনসহ আন্দোলনের অন্য নেতৃবৃন্দ যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, শিল্পকলা চর্চা করা মানে ধর্মবিরোধী হওয়া নয়। তবে এই প্রগতিশীল চিন্তার কারণে তাঁদের রক্ষণশীল নবাব পরিবার ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকদের তীব্র বিরোধিতা, মানসিক নির্যাতন এবং জীবননাশের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে কুৎসা রটানো হয়েছিল, যদিও এই আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল উদার মানবতাবাদ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রভাব কেবল সমসাময়িক সময়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ষাটের দশকের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে এই মুক্তবুদ্ধি চর্চার গভীর প্রভাব ছিল। যদিও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা ও পশ্চাৎপদ চিন্তা দেখা দিয়েছে, তবুও উদার মানবতাবাদের যে ধারা বাংলাদেশে বিদ্যমান, তা এই আন্দোলনেরই উত্তরাধিকার।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইউরোপের রেনেসাঁস বা ভারতে রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কার উদ্যোগগুলোও শুরুতে ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে তীব্র বাধা পেয়েছিল। গিওর্দানো ব্রুনো বা গ্যালিলিওর মতো মুক্তচিন্তাবিদদের করুণ পরিণতি হয়েছিল চার্চের হাতে। ঠিক তেমনিভাবে, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের কর্মীদেরও 'ধর্মবিরোধিতার' তকমা দেওয়া হয়েছিল। তবে যতীন সরকার তাঁর ‘মুক্তবুদ্ধির চড়াই-উতরাই’ গ্রন্থে স্পষ্ট করেছেন যে, এই আন্দোলন ধর্মের বিরোধী ছিল না, বরং বিকৃত ব্যাখ্যা থেকে ধর্মকে মুক্ত করে প্রকৃত ধর্ম ও বিশ্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।

মুসলিম সাহিত্য সমাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সংঘবদ্ধভাবে মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা, যা এর আগে বিচ্ছিন্ন প্রয়াস হিসেবে দেখা যেত। যদিও মোতাহের হোসেন চৌধুরী স্বীকার করেছেন যে, তৎকালীন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সাম্প্রদায়িকতার কারণে এই আন্দোলন তার পূর্ণ লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, কারণ তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে মনোজগতের উৎকর্ষ সাধন, রাজনীতি নয়।

বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেখানে ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা এবং নারীবিদ্বেষ আবারও প্রকট হচ্ছে, সেখানে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে গেছে। যতক্ষণ সমাজে অজ্ঞানতা ও কুসংস্কার থাকবে, ততক্ষণ এই লড়াই প্রাসঙ্গিক থাকবে। সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চাকে বেগবান করার মাধ্যমেই এই পুনর্জাগরণ সম্ভব, কারণ সংস্কৃতিই হলো প্রকৃত লক্ষ্য এবং রাজনীতি সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম মাত্র।