মানুষের রক্তের অ্যান্টিবডির বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে রোগ শনাক্ত হওয়ার ১০ বছর আগেই ‘ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ’ বা আইবিডির পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে, যা প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি চিহ্নিত করার নতুন পথ খুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। মূলত ‘ক্রোনস ডিজিজ’ ও ‘আলসারেটিভ কোলাইটিস’—এই দুই রূপের আইবিডির ক্ষেত্রে পরিপাকতন্ত্রের ক্ষতি হওয়ার পর সাধারণত চিকিৎসা শুরু হয়। তবে গবেষকদের দাবি, দৃশ্যমান উপসর্গ আসার অনেক আগেই মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম সতর্ক সংকেত পাঠাতে শুরু করে।

নেদারল্যান্ডসের ‘ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার গ্রনিংগেন’ এবং নিউ ইয়র্কের ‘আইকান স্কুল অফ মেডিসিন অ্যাট মাউন্ট সিনাই’-এর গবেষক ড. আরনো বুরগোনজে জানান, দীর্ঘকাল ধরে এই রোগের চিকিৎসা কেবল পরিপাকতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরেই দেওয়া সম্ভব হতো, যা অনেক ক্ষেত্রে অনেক দেরি হয়ে যেত। তিনি উল্লেখ করেন, ইমিউন সিস্টেমের মাধ্যমে রোগটি শুরু হওয়ার অনেক আগেই সতর্কবার্তা পাওয়া সম্ভব হলেও এটি এখনো চূড়ান্ত কোনো diagnostic পরীক্ষা নয়, যা নিশ্চিতভাবে অসুস্থতার কথা বলে দেবে। তবে ভবিষ্যৎ প্রতিরোধে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ এই দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহজনিত রোগে আক্রান্ত, যার ফলে তীব্র পেট ব্যথা, অবসাদ ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। বংশগত কারণ, অণুজীব এবং ত্রুটিপূর্ণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কারণে এই রোগ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে প্রদাহবিরোধী ওষুধ ব্যবহার করা হলেও অনেকের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয় না এবং শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলতে হয়। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ফলে ক্যান্সারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। এই ঝুঁকি এড়াতেই শুরুর দিকের লক্ষণ খোঁজার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষণাটি পরিচালনার জন্য ড. বুরগোনজে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর ৫০০ জন সদস্যের মোট দুই হাজার রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। এর মধ্যে ২০০ জন পরে ক্রোনস ডিজিজে এবং ২০০ জন আলসারেটিভ কোলাইটিসে আক্রান্ত হন, বাকি ১০০ জন সুস্থ ছিলেন। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যারা পরবর্তীতে ক্রোনস ডিজিজে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের রক্তে ‘অ্যাপস্টাইন-বার ভাইরাস’-এর বিরুদ্ধে লড়াইকারী অ্যান্টিবডির উপস্থিতি বেশি ছিল এবং এই পার্থক্য ১০ বছর আগেই দৃশ্যমান হয়। বিশেষ করে যাদের রোগটি জটিল আকার ধারণ করেছিল, তাদের ক্ষেত্রে এই সংকেত ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট। অন্যদিকে, আলসারেটিভ কোলাইটিসের রোগীদের রক্তে দেহের নিজস্ব প্রোটিনের বিরুদ্ধে লড়াই করা অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

চিকিৎসা সাময়িকী ‘গাট’-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি বার্সেলোনার ‘ইউনাইটেড ইউরোপীয় গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি’ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি সরাসরি কোনো ভাইরাসের কারণে আইবিডি হওয়ার প্রমাণ নয়, তবে একটি যোগসূত্র নির্দেশ করে। তারা আশা করছেন, টাইপ-১ ডায়াবেটিসের মতো আইবিডির ক্ষেত্রেও রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে আগাম চিকিৎসা শুরু করে রোগের প্রকোপ কমানো যাবে।

বার্টস হেলথ-এর অধ্যাপক জেমস লিন্ডসে এই সমীক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করলেও সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রযুক্তিটি বর্তমানে কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ এবং সরাসরি চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রয়োগের জন্য প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে, ‘ক্রোনস অ্যান্ড কোলাইটিস ইউকে’-এর প্রধান নির্বাহী মারিয়েন র‍্যাডক্লিফ মনে করেন, লক্ষণ প্রকাশের বহু বছর আগের শারীরিক পরিবর্তনগুলো বুঝতে এই গবেষণা রোগীদের জন্য একটি বড় অগ্রগতি।