শরীরের ক্যালসিয়াম শোষণ, দাঁত ও হাড়ের মজবুতি এবং পেশির স্বাভাবিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে ভিটামিন ডি-র ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত সূর্যের আলো এবং নির্দিষ্ট কিছু খাবার থেকে এই ভিটামিন পাওয়া যায়। তবে এই পুষ্টি উপাদানটি নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত থাকায় অনেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণে উদাসীন থাকেন, আবার কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তোলেন।

অনেকের ধারণা ভিটামিন ডি পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো সূর্যের আলো। তবে এটি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরি করলেও ডিমের কুসুম, চর্বিযুক্ত মাছ এবং ফোর্টিফাইড বা ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার থেকেও এটি পাওয়া সম্ভব। উল্লেখ্য যে, ত্বকের রং, বয়স, ঋতু এবং আলোর তীব্রতার ওপর এর উৎপাদন নির্ভর করে। এমনকি জানালার কাঁচের ভেতর দিয়ে আসা রোদ ত্বকে এই ভিটামিন তৈরিতে কোনো প্রভাব ফেলে না।

অনেকেই মনে করেন প্রতিদিন রোদে থাকলেই শরীরে এর ঘাটতি হবে না। কিন্তু বয়স বাড়লে, ত্বকের রং গাঢ় হলে কিংবা দীর্ঘসময় ঘরের ভেতরে থাকলে নিয়মিত রোদে থাকা সত্ত্বেও ঘাটতির ঝুঁকি থাকে। এছাড়া চর্বি শোষণের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই কেবল রোদে থাকার ওপর নির্ভর না করে খাদ্যাভ্যাস ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

দুধকে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের উৎস হিসেবে ধরা হলেও সব দুধে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকে না। কিছু দেশে কৃত্রিমভাবে দুধে এটি যোগ করা হয়, তাই প্যাকেটজাত দুধ কেনার সময় লেবেলে পুষ্টি-তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মাছ ও ডিমের মতো বিকল্প উৎসগুলো খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত।

ভিটামিন ডি চর্বিতে দ্রবণীয় হওয়ায় অনেকে মনে করেন এটি শোষণের জন্য প্রচুর চর্বিযুক্ত খাবার খেতে হবে। আসলে পরিমিত চর্বি শোষণ প্রক্রিয়ায় সাহায্য করলেও অতিরিক্ত তেল বা ঘি খাওয়ার প্রয়োজন নেই। মাছ, বীজ এবং বাদামের মতো সুষম খাবারই এর জন্য যথেষ্ট।

বেশি পরিমাণে ভিটামিন ডি গ্রহণ করলে বেশি উপকার হবে—এমন ধারণা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত মাত্রায় এই ভিটামিন গ্রহণ করলে রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে, যার ফলে বমি বমি ভাব, শারীরিক দুর্বলতা এবং কিডনিতে পাথরের মতো গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এন্ডোক্রাইন সোসাইটি’র নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ৭৫ বছরের কম বয়সী সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি ভিটামিন ডি নিয়মিত গ্রহণের বিশেষ কোনো বাড়তি উপকারের প্রমাণ নেই।

সবশেষে, সবার জন্য ভিটামিন ডি পরীক্ষা বা সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন—এই ধারণাটিও ভুল। বয়স এবং শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে এর প্রয়োজন ভিন্ন হয়। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে রক্তে ২৫-হাইড্রক্সিভিটামিন ডি পরীক্ষা করতে পারেন, তবে সুস্থ ও উপসর্গহীন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিয়মিত এই পরীক্ষার কোনো বৈশ্বিক সুপারিশ নেই। ঘাটতির সন্দেহ হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়। সুষম খাদ্য, সঠিক সূর্যালোক এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের মাধ্যমেই এই পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব।