মুন্সিগঞ্জের বালাশুরে অবস্থিত নাগরনন্দী ঘোষবাড়ির দুর্গাপূজা বর্তমানে হয়ে উঠেছে পারিবারিক ঐক্য এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক বিশেষ কেন্দ্র। ২০১৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সুসংগঠিতভাবে শুরু হওয়া এই পূজা এখন পরিবারের ১৪টি ভিন্ন শাখার সদস্যদের একত্রিত করার প্রধান উপলক্ষ। জীবিকার তাগিদে সারা বছর যারা দূরে থাকেন, তারা পূজার দিনগুলোতে এক ছাদের নিচে মিলিত হয়ে পূর্বপুরুষদের রীতিনীতি চর্চা করেন এবং নতুন প্রজন্মের সাথে পুরনোদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। এই আয়োজনটি বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বাধিকারীর গ্রামের বাড়ির পূজা হিসেবেও স্থানীয়ভাবে পরিচিত।
পূজার অন্যতম উদ্যোক্তা প্রমীত কুমার ঘোষ জানান, আগে এই বাড়িতে বিচ্ছিন্নভাবে পূজা হলেও ২০১৫ সাল থেকে পরিবারের সকল সদস্য মিলে বড় পরিসরে এটি আয়োজন করা শুরু করেন। মূলত শহরকেন্দ্রিক ব্যস্ত জীবনে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে এবং নতুন প্রজন্মের সাথে বয়োজ্যেষ্ঠদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। যদিও করোনা মহামারি এবং দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে মাঝেমধ্যে আয়োজনের পরিধি সীমিত করতে হয়েছে, তবে পারিবারিক সংহতির আকাঙ্ক্ষা থেকে তারা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
এ বছরের পূজায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে 'সম্প্রীতির বাংলাদেশ' থিমটিকে। মণ্ডপে মসজিদ, মন্দির ও গির্জার প্রতীকী উপস্থাপনের মাধ্যমে ধর্মীয় সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বার্তা দেওয়া হয়েছে। শুভ শক্তির জয়ের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব ও সম্প্রীতির কথা মনে করিয়ে দেওয়াই এই থিমের মূল উদ্দেশ্য। এছাড়া প্রতিমার সাজসজ্জায় বিশেষ বৈচিত্র্য আনতে কলকাতার কুমারটুলি থেকে অলংকার ও সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়।
আর্থিক দিক থেকে এই পারিবারিক উৎসবটি এখন বেশ বড় পরিসরে বিস্তৃত। উদ্যোক্তা দীপক কুমার ঘোষের মতে, গত বছর এই আয়োজনে ২০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছিল এবং এ বছর তা প্রায় ২৫ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে। পরিবারের সদস্যরা সাধ্যমতো অর্থ ও শ্রম দিয়ে এই ব্যয়ভার বহন করেন। তবে এই আয়োজনে কেবল পরিবারের সদস্যরা নন, বরং স্থানীয় মুসলিম প্রতিবেশী ও বন্ধুরাও অনুদান দিয়ে সহায়তা করেন। এছাড়া সরকারিভাবে প্রায় ৬০০ কেজি চাল সহায়তা পাওয়া গেছে। প্রতিবেশীদের এই অংশগ্রহণ পূজাকে একটি নির্দিষ্ট পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর সামাজিক বন্ধনে রূপ দিয়েছে।
উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো প্রসাদ বিতরণ। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার ভক্তের মাঝে প্রসাদ বিতরণের লক্ষ্য থাকে। ভুনা খিচুড়ি, ছানাপোড়া, লুচি, সুজি, হালুয়া এবং বিভিন্ন মিষ্টির আয়োজন থাকে এখানে। বিশেষ করে পরিবারের নারী সদস্যরা মণ্ডপ সাজানো এবং ঐতিহ্যবাহী নাড়ু-মোয়া তৈরির কাজে নেতৃত্ব দেন। ত্রয়ী ঘোষ জানান, তাঁর বড়মার শেখানো নিয়ম মেনেই এখনো এই রীতিনীতিগুলো চলে আসছে। পরিবারের ছোট সদস্য হিয়া ঘোষের মতো নতুন প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরাও এই ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহী এবং ভবিষ্যতে এই দায়িত্ব বহনের ইচ্ছা পোষণ করছে।




