বাঙালি জাতির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে অনেক সময় বিভাজন তৈরি করা হলেও, বাস্তবে এই দুই মহান কবির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণায় বলা হয় যে, রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে পাগল করে দিয়েছিলেন যাতে তিনি নোবেল পুরস্কার না পান। তবে তথ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান, তখন নজরুলের বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর এবং তাঁর তেমন কোনো পরিচিতি বা প্রকাশিত লেখা ছিল না। বরং নজরুল রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি এতটাই অনুরাগী ছিলেন যে, সমসাময়িক মুজফ্ফর আহমদ তাঁকে 'রবীন্দ্রসংগীতের হাফিজ' বলে অভিহিত করেছিলেন। নজরুলের প্রীতিগীতির কোমলতার পেছনে রাবীন্দ্রিক চেতনার গভীর প্রভাব ছিল স্পষ্ট, যার প্রমাণ মেলে ১৯১৭ সালে করাচি সেনানিবাসে রচিত তাঁর 'ব্যথার দান' গল্পে।
দুই কবির মধ্যে বয়সের ব্যবধান ছিল ৩৮ বছর, তা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ নজরুলের কাব্যপ্রতিভার ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। ১৯২০ সালে 'মোসলেম ভারত' পত্রিকায় নজরুলের কবিতা প্রকাশিত হলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ব্যক্তিগত সচিব সুধাকান্ত রায় চৌধুরীর মাধ্যমে নিয়মিত সেই কবিতাগুলোর খোঁজ নিতেন। নজরুলের প্রতি এই সাহিত্যিক আগ্রহ এবং মুগ্ধতা ছিল প্রগাঢ়। বিশেষ করে যখন নজরুল সাম্প্রদায়িক আক্রমণ ও ব্রিটিশ শাসনের চাপের মুখে ছিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁকে স্নেহের আশ্রয় প্রদান করেন। নজরুলের কাব্যচর্চা যাতে কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেই উদ্দেশ্যেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'বসন্ত' গীতিনাট্যটি নজরুলের নামে উৎসর্গ করেন। ১৯২৩ সালে আলীপুর জেলে কারাবন্দি নজরুলের কাছে এই গ্রন্থের দুটি কপি পাঠানো হয়। কোনো নবীন কবিকে এভাবে গ্রন্থ উৎসর্গ করার নজির রবীন্দ্রনাথের অন্য কোথাও নেই। রবীন্দ্রপ্রেমীদের একাংশের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, যারা নজরুলের কবিতার রূপ ও রস উপলব্ধি করেনি, তারাই এই উৎসর্গের বিরোধিতা করছে।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, যুগের মনকে প্রতিফলিত করতে পারা কাব্যই প্রকৃত মহাকাব্য, এবং জনপ্রিয়তাকে তিনি কাব্য বিচারের স্থায়ী মাপকাঠি মনে করতেন না। তিনি নজরুলের কাব্যচর্চাকে উৎসাহিত করে বলেছিলেন যে, যুদ্ধের ময়দানে প্রেরণা জোগানোর জন্য কবির প্রয়োজন। নজরুলের প্রতি এই মমতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে যখন তিনি হুগলি জেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অনশন শুরু করেন। শিলং থেকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে অনশন ত্যাগ করার অনুরোধ জানান, কারণ বাংলা সাহিত্যের জন্য নজরুলের প্রয়োজন ছিল অপরিসীম। যদিও জেল কর্তৃপক্ষের বাধাগ্রাহিতার কারণে সেই বার্তা নজরুলের কাছে পৌঁছায়নি, তবে এই ঘটনায় রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত আহত হয়েছিলেন এবং তাঁর পুত্র রথীনের কাছে চিঠিতে নজরুলের প্রাণনাশের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন।
জনপ্রিয়তার দিক থেকে এক সময় নজরুল রবীন্দ্রনাথকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন, যা রবীন্দ্রনাথ নিজেও জানতেন এবং এতে তাঁর কোনো আপত্তি ছিল না। ১৯৩৪ সালে হেমন্তবালা দেবীর কাছে লেখা এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, কেউ যদি তাঁর চেয়ে নজরুলের কবিতাকে বেশি পছন্দ করে, তবে তিনি তাকে কম স্নেহ করবেন না। অন্যদিকে, নজরুলও অন্যদের রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়তে উৎসাহিত করতেন। তাঁর মতে, বড় কবিদের লেখা পড়লে চিন্তার বদ্ধ ধারা মুক্তি পায়। রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর নজরুলের শোকাতুর মন 'রবিহারা' কবিতার জন্ম দেয় এবং কলকাতা বেতারে তিনি ঐতিহাসিক সংগীত পরিবেশন করেন। পরিশেষে বলা যায়, দুই কবির মধ্যকার এই অনন্য সম্পর্কটি ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঊর্ধ্বে।




