সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকের হাট’। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন আগামী দুই থেকে তিন দিন চলবে। কটিয়াদী সদরের পুরান বাজার এলাকা এখন ঢাক, ঢোল, কাঁসি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি ও বাঁশির সুরের মূর্ছনায় মুখরিত। এই হাটে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দুই শতাধিক বাদকদল তাদের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হাজির হয়েছেন, যাদের লক্ষ্য হলো পূজা আয়োজকদের মুগ্ধ করে চুক্তিবদ্ধ হওয়া।
উল্লেখ্য যে, ‘ঢাকের হাট’ নাম হলেও এখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। বরং এটি একটি প্রদর্শনী এবং নিয়োগের কেন্দ্র। বাদ্যযন্ত্রের দক্ষ বাদক ও দলগুলো তাদের সেরা সুর বাজিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। অন্যদিকে, পূজা আয়োজকরা বিভিন্ন দলের বাজনা শুনে, তাদের দক্ষতা যাচাই করে এবং দরদাম করার পর চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করেন। সম্মানির পরিমাণ নির্ধারিত হয় দলের সদস্য সংখ্যা, বাদ্যযন্ত্রের ধরন এবং পারদর্শিতার ওপর ভিত্তি করে। সাধারণত একজন ঢাকির পারিশ্রমিক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা হয়ে থাকে, তবে সম্পূর্ণ একটি যন্ত্রীদলের ভাড়া এক লাখ টাকারও বেশি হতে পারে।
এবারের হাটে বিক্রমপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শিল্পীরা এসেছেন। বিক্রমপুরের ঢাকি পরিমল দাস জানান, ফোনে যোগাযোগ হলেও সরাসরি এই হাটে আসার আনন্দই আলাদা। তিনি ৩০ হাজার টাকা দাবি করেছেন এবং দরদাম চলছে। অন্যদিকে, কুমিল্লা থেকে দশ সদস্যের দল নিয়ে আসা কাজল মণিঋষি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা চুক্তির আশা করছেন এবং জানিয়েছেন, লাখ টাকার কম হলে তিনি বাজাতে যাবেন না। আবার গাজীপুরের টঙ্গী থেকে আসা শ্যামল পণ্ডিত প্রথমবার এই হাটে এসে মুগ্ধ হয়েছেন এবং বিক্রমপুরের একটি পাঁচ সদস্যের দলের সাথে ৭৮ হাজার টাকায় চুক্তি করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন, এই হাট এখন আর কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নয়, বরং এটি সকল ধর্মের মানুষের জন্য এক সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। অনেক মানুষ কেবল সুরের মূর্ছনা শোনার জন্য এখানে ভিড় করেন।
এই ঐতিহ্যের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘শ্রীমা সংঘ’-এর সাধারণ সম্পাদক জীবন কুমার সাহার মতে, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের শাসনামলে এই হাটের সূচনা হয়। রাজপ্রাসাদে পূজার জন্য সেরা ঢাকির খোঁজে বিক্রমপুরে বার্তা পাঠানো হয়েছিল এবং সেখান থেকে নৌপথে বহু শিল্পী কটিয়াদীতে এসেছিলেন। রাজা নিজে তাদের যাচাই করে সেরা দল নির্বাচন করতেন, যা পরবর্তী সময়ে এই ঐতিহ্যে রূপ নেয়। বর্তমানে স্থানীয় পূজা উদযাপন পরিষদ আসা বাদকদলের থাকা-খাওয়া এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। এছাড়া কোনো শিল্পী যদি চুক্তি করতে ব্যর্থ হন, তবে তাদের বাড়ি ফেরার যাবতীয় খরচ ও ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ‘শ্রীমা সংঘ’।




