সম্প্রতি পোপ লিও চতুর্দশের ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার খবরটি জনমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, পোপ লিও কখনোই ধূমপান করেননি। সাধারণত ফুসফুসের ক্যানসার মানেই বয়স্ক পুরুষ এবং ধূমপায়ীদের কথা মাথায় আসে, কিন্তু গত ১৫ বছরে এই রোগের ধরন বদলে গেছে। এখন নারী, তরুণ এবং যারা জীবনভর ধূমপান থেকে দূরে থেকেছেন, তাদের মধ্যেও এই রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারীদের মধ্যে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ এখন ফুসফুসের ক্যানসার। প্রতি বছর স্তন, ডিম্বাশয় বা কোলন ক্যানসারের চেয়ে ফুসফুসের ক্যানসারে বেশি নারীর মৃত্যু হচ্ছে। আমেরিকান লাং অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুসারে, গত ৪৪ বছরে নারীদের মধ্যে এই রোগের হার ৭৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৪৩ শতাংশ কমেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরুষদের তুলনায় তরুণ নারীদের মধ্যে এই রোগ শনাক্ত হওয়ার হার বেশি দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপান না করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরিবেশগত দূষণ এবং বংশগতি বা জেনেটিক্স এই রোগের প্রধান কারণ হতে পারে। পোপ লিও চতুর্দশের মতো প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়লে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা নিরাময় করা সম্ভব। তবে বড় সমস্যা হলো, বর্তমান স্ক্রিনিং নির্দেশিকায় যারা ধূমপান করেননি তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে এই রোগীদের টিউমার প্রায়ই আকস্মিকভাবে ধরা পড়ে, যা অনেক সময় রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব ঘটায়।

নারীদের মধ্যে এই বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। অনেকে পুরুষদের তুলনায় দেরিতে ধূমপান শুরু করেছেন, যার ফলে তাদের রোগ শনাক্ত হওয়ার সময়কাল পিছিয়ে গেছে। এছাড়া ফিল্টারযুক্ত সিগারেটের ব্যবহার ফুসফুসের বাইরের অংশে 'অ্যাডেনোকার্সিনোমা' নামক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপান বা সেকেন্ড-হ্যান্ড স্মোকের প্রভাবে নারীরা পুরুষদের চেয়ে দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছেন। বর্তমানে ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের প্রায় ২০ শতাংশ কখনোই ধূমপান করেননি, যা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি।

ধূমপানের বাইরেও আরও কিছু ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন থোরাসিক অনকোলজিস্টরা। এর মধ্যে রয়েছে পরিবারের ক্যানসারের ইতিহাস, অ্যাসবেস্টস, রেডন এবং বায়ু দূষণের প্রভাব। এছাড়া আর্সেনিক, বেরিলিয়াম, ক্যাডমিয়াম, সিলিকা ও নিকেলের মতো রাসায়নিক উপাদানের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি। বর্তমানে ই-সিগারেট এবং মারিজুয়ানা ধূমপানের প্রভাব নিয়েও গবেষণা চলছে। ব্রেস্ট ক্যানসারের BRCA1 এবং BRCA2 জিনের মতো ফুসফুসের ক্যানসারেও নির্দিষ্ট কিছু জিনগত পরিবর্তনের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০২১ সালে স্ক্রিনিং নির্দেশিকা আপডেট করে বয়স ৫০ থেকে ৮০ বছর এবং ২০ বছর ধরে দিনে এক প্যাকেট করে ধূমপান করেছেন এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞারা বলছেন, শুধুমাত্র ধূমপায়ীদের ওপর নির্ভর না করে ঝুঁকি অনুযায়ী লো-ডোজ সিটি স্ক্যানের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ যেমন—দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, চরম ক্লান্তি এবং পিঠ, বুক বা কাঁধের ব্যথাকে সাধারণ অসুস্থতা মনে করে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে তরুণ নারীরা এই লক্ষণগুলো দীর্ঘক্ষণ সহ্য করেন এবং চিকিৎসকরাও কম বয়সের কারণে একে ক্যানসার হিসেবে সন্দেহ করেন না, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।