বগুড়ার শেরপুর শহরের দক্ষিণ সাহাপাড়ার বাসিন্দা ৩৭ বছর বয়সী শ্রীকান্ত সরকারের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনেছে প্রতিমা তৈরির শিল্প। একসময় চরম অভাবের সংসারে বড় হওয়া শ্রীকান্ত এখন একজন দক্ষ প্রতিমাশিল্পী, যার তৈরি প্রতিমার খ্যাতি বগুড়ার পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ এক দশকের অভিজ্ঞতা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে এই কাজই এখন তাঁর আয়ের প্রধান উৎস। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা আয় করেন তিনি, যা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সঞ্চয়ও করছেন। সম্প্রতি তিনি জমি কিনে এক ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট শ্রীকান্তর শৈশবের স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে চাকরি করা। তবে বাবার অসুস্থতা এবং পরিবারের আর্থিক দৈন্যতার কারণে সেই স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। অল্প বয়সেই উপার্জনের তাগিদে তিনি বাবার ইচ্ছায় প্রতিমা তৈরির কাজ শেখার সিদ্ধান্ত নেন। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার একজন প্রতিমাশিল্পীর অধীনে টানা ১২ বছর সহকারী হিসেবে কাজ করে তিনি বাঁশের কাঠামো তৈরি, খড় জড়ানো, মাটির প্রলেপ দেওয়া, মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলা এবং রং করার মতো খুঁটিনাটি সব দক্ষতা অর্জন করেন। হাতে-কলমে এই দীর্ঘ অনুশীলনের পর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলে তিনি স্বতন্ত্রভাবে কাজ শুরু করেন।
শ্রীকান্তর কাজের পরিধি কেবল দুর্গাপূজাতেই সীমাবদ্ধ নয়; সারা বছর তিনি লক্ষ্মী, কালী, সরস্বতী, গণেশ, বিশ্বকর্মা ও মহাদেবের প্রতিমা তৈরি করেন। তবে শারদীয় দুর্গাপূজার আগে কাজের চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। গত বছর ২০টি দুর্গা প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি এবারও তিনি একই সংখ্যক কাজ হাতে নিয়েছেন। প্রতিমার আকার ও নকশার ওপর ভিত্তি করে এর দাম ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার বেশি হয়ে থাকে। উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি হলেও প্রতিমার দাম খুব একটা বাড়েনি বলে জানান তিনি।
এত বিপুল পরিমাণ কাজ একা সামলানো অসম্ভব হওয়ায় শ্রীকান্তর সঙ্গে আটজন সহকারী কাজ করেন, যাদের মধ্যে অভিজ্ঞ শ্রমিকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীও রয়েছেন। কাজের ধরন অনুযায়ী তাদের দৈনিক মজুরি ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা। সহকারীদের একজন এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সৈকত সরকার জানান, এই কাজের আয় তাঁর পড়াশোনার খরচ চালাতে সাহায্য করে। এছাড়া লিটন দাস ও পলাশ সরকারও এই কাজের মাধ্যমে তাদের সংসার পরিচালনা করছেন।
শ্রীকান্তর এই সাফল্যের গল্প কেবল নিজের সচ্ছলতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, তিনি অন্যদের জন্যও আয়ের পথ তৈরি করেছেন। তাঁর কাছে কাজ শিখে শ্রাবণ শীল, শোভন ঘোষ, সজীব সরকার এবং রাজিব দাস নামের চারজন এখন স্বাধীন কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে শ্রাবণ শীল এবার আটটি প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছেন এবং দেড় লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন।
শ্রীকান্তর কাছে প্রতিমা তৈরি কেবল জীবিকা নয়, বরং এটি তাঁর সৃজনশীলতা প্রকাশের একটি মাধ্যম। প্রতিটি প্রতিমাকে নিখুঁত করতে তিনি বিশেষ নজর দেন এবং নির্ধারিত সময়ে ডেলিভারি দিতে দিনরাত খাটেন। বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও হিন্দু মহাজোটের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ জানান, শেরপুরের ৯৪টি মণ্ডপে এবার দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে শ্রীকান্তের মতো দক্ষ কারিগরদের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি নিজের জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।




