যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে টানা পঞ্চমবারের মতো কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ইলহান ওমর। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের পঞ্চম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট (মিনিয়াপোলিস ও পার্শ্ববর্তী শহরতলি) থেকে তিনি এই সাফল্য অর্জন করেন। বার্তা সংস্থা এপি-র তথ্য অনুযায়ী, ৯৯ শতাংশ ভোট গণনার পর ইলহান ৭৬ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন, যেখানে তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী জন নেইগল পেয়েছেন মাত্র ১৬ শতাংশের কিছু বেশি ভোট। জয়ের পর এক বিবৃতিতে ইলহান ওমর জানান, ভয়, বিভেদ, ঘৃণা ও সংকীর্ণতাকে জয় করে তারা নিজেদের আদর্শ ও বিশ্বাসের প্রমাণ দিয়েছেন।
এই জয়টি এমন এক সময়ে এল যখন তিনি প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে ছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থীরা তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছিলেন। এমনকি নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে গত মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে তাঁর বাসভবনে তল্লাশি চালিয়েছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসের (এইচএসআই) কর্মকর্তারা। তবে এসব প্রতিকূলতা ইলহানকে দমাতে পারেনি; বরং তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি এই অন্যায়ের সামনে চুপ থাকবেন না।
ইলহান ওমরের জীবনসংগ্রাম অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। ১৯৮২ সালে সোমালিয়ার মোগাদিসুতে জন্ম নেওয়া ইলহান শৈশবে মা হারান। ১৯৯১ সালে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে আট বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে সোমালিয়া ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘ চার বছর কেনিয়ার একটি শরণার্থীশিবিরে বসবাসের পর ১৯৯৫ সালে তাঁর পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। শুরুতে নিউইয়র্কে থাকলেও পরে স্থানীয় একটি গির্জার সহায়তায় ১৯৯৭ সালে তাঁরা মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং ২০০০ সালে ইলহান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন।
শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ইলহান মাত্র তিন মাসের মধ্যে ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেন। তিনি নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর হামফ্রে স্কুল অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্সে পলিসি ফেলো এবং মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিউনিটি নিউট্রিশন এডুকেটর হিসেবে কাজ করেন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি শিশুদের পুষ্টিবিষয়ক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন নেটওয়ার্কের নীতি পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৬ সালে প্রথমবার মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের আইনসভার সদস্য হওয়ার পর ২০১৮ সালে তিনি প্রথমবারের মতো মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন। তিনি ছিলেন প্রথম শরণার্থী, প্রথম মুসলিম নারী এবং প্রথম অশ্বেতাঙ্গ মার্কিন হিসেবে মিনেসোটা থেকে কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি।
কংগ্রেসে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল কট্টর। সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর পক্ষে তিনি সোচ্চার ছিলেন। তবে মার্কিন ও ইসরায়েলি রাজনীতিতে ইসরায়েলি লবির প্রভাব নিয়ে সমালোচনার কারণে তিনি নিজস্ব দল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরেও বিতর্কের মুখে পড়েছেন এবং অনেকে তাঁকে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর জন্মস্থান এবং নাগরিকত্ব নিয়ে বারবার আক্রমণ করেছেন এবং এমনকি সোমালিয়ার প্রধানের কাছে তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। এর জবাবে ইলহান চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, তিনি আর সেই অসহায় আট বছরের শিশু নন যে যুদ্ধ থেকে পালিয়েছিল, বরং এখন তিনি একজন আত্মবিশ্বাসী মার্কিন নাগরিক।
বর্তমানে ৪৪ বছর বয়সী ইলহানের স্বামী টিম ম্যানেট একজন রাজনৈতিক পরামর্শক, যিনি তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের তিনটি সন্তান রয়েছে। এর আগে আহমেদ হিরসি এবং আহমেদ নূর সাইদের সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল।




