যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় এবং কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে তীব্র অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের আবহে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার গুঞ্জন ছড়িয়েছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রতি হেগসেথের কট্টর সমর্থনের কারণে ভোটারদের মধ্যে যে ক্ষোভ ছিল, তার প্রতিফলন নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতির মাঝেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি হেগসেথকে সরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন না এবং তাঁর মতে হেগসেথ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

ঐতিহাসিকভাবে এই পরিস্থিতি ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে সময় ইরাক যুদ্ধ নিয়ে জনগণের তীব্র অসন্তোষের মুখে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডকে বরখাস্ত করেছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের অবস্থান বুশের সেই সিদ্ধান্তের বিপরীত। তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কিছু উপদেষ্টা মনে করছেন, এই পরাজয়ের জন্য কাউকে না কাউকে দায়ী করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রধান সমর্থক হিসেবে হেগসেথ ‘ছাঁটাইয়ের’ মুখে পড়তে পারেন। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন যে, ইরান যুদ্ধের যৌক্তিকতা ছিল কি না এবং এই যুদ্ধই রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

পিট হেগসেথ কেবল বিরোধী দল নয়, বরং নিজের দলের ভেতরেও বিতর্কিত হয়ে উঠেছেন। রিপাবলিকান প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য টমাস ম্যাসি কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই সামরিক অভিযান শুরু করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এছাড়া সিনেটর টম টিলিস জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দেড় লাখ কোটি ডলারের প্যাকেজ পাস করানোর ক্ষেত্রে হেগসেথের সঙ্গে আইনপ্রণেতাদের টানাপোড়েন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। টিলিসের মতে, বর্তমান কংগ্রেসের বাকি ৬০ দিনে হেগসেথই এই দায়িত্ব পালনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা পেন্টাগনের পরিচালনায় হেগসেথের ভূমিকার বিষয়ে ব্যাপক তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই তদন্তের আওতায় ইরান যুদ্ধ পরিচালনা, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের অপসারণ এবং ইউক্রেন নীতির পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার জলসীমায় নৌযানের ওপর হামলার মতো বিষয়গুলো থাকতে পারে। কিছু ডেমোক্র্যাট সদস্য এই সামরিক হামলাগুলোকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য করছেন। তবে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল দাবি করেছেন, হেগসেথ কোনো রাজনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করবেন না এবং তিনি ২০২৯ সালের ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এই টানাপোড়েনের মাঝে একটি বিকল্প সম্ভাবনা হিসেবে আলোচিত হচ্ছে টেনেসির সিনেটর মার্শা ব্ল্যাকবার্নের শূন্য হওয়া আসনে হেগসেথকে নিয়োগ দেওয়া। ব্ল্যাকবার্ন টেনেসির গভর্নর নির্বাচিত হওয়ায় আগামী জানুয়ারিতে তাঁর সিনেট আসনটি খালি হবে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, হেগসেথ ওই পদের জন্য জনপ্রিয় হতে পারেন। উল্লেখ্য, পেন্টাগন সংস্কারের জন্য ট্রাম্প হেগসেথকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিলেও সম্প্রতি একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা বাতিল করে তাঁর সঙ্গে সামান্য মতবিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমানে হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগন উভয় পক্ষই হেগসেথের পদে থাকার বিষয়েই কথা বলছে, যদিও ক্যাপিটল হিলের বিরোধের কারণে তাঁকে পরিবর্তনের আলোচনা পর্দার আড়ালে চলছে।