হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা জশুয়া ওয়ং-কে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। শহরের বিতর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় বিদেশি শক্তির সাথে যোগসাজশ করার দায়ে এই সাজা দেওয়া হয়। ২০২০ সালে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ বিরোধী তীব্র গণবিক্ষোভের পর এই কঠোর আইনটি কার্যকর করা হয়েছিল, যার অধীনে ইতিমধ্যে শত শত সাধারণ নাগরিক ও অধিকারকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন।
আদালতের রায় অনুযায়ী, জশুয়া ওয়ং-এর এই ১০ বছরের মেয়াদের মধ্যে মাত্র দুই মাস দুই দিন তার বর্তমান কারাবাস বা অন্য সাজার সাথে একযোগে চলবে। উল্লেখ্য, তিনি ইতিপূর্বেই দীর্ঘ ছয় বছর কারাগারে কাটিয়েছেন এবং আগামী জানুয়ারিতে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। তবে নতুন এই দণ্ডের ফলে তাকে আরও এক দশক জেলখানায় কাটাতে হবে। গত সেপ্টেম্বরে তিনি এই অভিযোগগুলো স্বীকার করে নিয়েছিলেন। প্রসিকিউশনের দাবি, ২০২০ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে জশুয়া এবং নির্বাসিত কর্মী নাথান ল-সহ আরও কয়েকজন ব্যক্তি বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে বিদেশি নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের জন্য লবিং করেছিলেন। জশুয়া ও নাথান ল একসময় 'ডেমোসিস্টো' নামক একটি গণতন্ত্রপন্থী রাজনৈতিক দলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
এই রায়ের পর হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী জন লি এক বিবৃতিতে জশুয়া ও নাথান ল-কে শহরের সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার মূল কারিগর হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, তাদের কর্মকাণ্ড জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় তারা হংকংয়ের এই পদক্ষেপের পূর্ণ সমর্থন করে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে চীনের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানায়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই রায় তীব্র সমালোচিত হয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকার এটিকে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করে অবিলম্বে এই ধরণের অন্যায্য মামলা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। মার্কিন কনস্যুলেট মনে করে, মৌলিক স্বাধীনতার কথা বলা ব্যক্তিদের মুখ বন্ধ করতে বেইজিং চরম পদক্ষেপ নিচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই সাজাকে 'নিষ্ঠুর ও অন্যায়' বলে অভিহিত করেছে। তাদের এশিয়ার পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বলেন, প্রভাবশালীদের দমাতে হংকং সরকার একের পর এক অভিযোগ সাজিয়ে তাদের কারারুদ্ধ করছে। এই জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সাজা পেয়েছেন সাবেক মিডিয়া টাইকুন জিমি লাই, যার মেয়াদ ২০ বছর।
জশুয়া ওয়ং-এর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল কৈশোরেই। ১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয়া জশুয়া ছোটবেলায় ডিসলেক্সিয়াতে আক্রান্ত ছিলেন, যা তার পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা তার ছিল প্রবল। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে থাকাকালীন ফেসবুকের মাধ্যমে ক্যান্টিনের খাবারের উচ্চমূলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন তিনি। ২০১৪ সালে 'আমব্রেলা মুভমেন্ট' বা ছাতা আন্দোলনের সামনে থেকে তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পান। যদিও তিনি নিজেকে কখনো 'নেতা' হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননি, বরং আন্দোলনের একজন সহায়তাকারীর কথা বলতেন। ২০২০ সালে তার দল ডেমোসিস্টো বিলুপ্ত হয় এবং এরপর তিনি আইনসভায় প্রার্থী হতে চাইলেও জাতীয় নিরাপত্তা আইনের বিরোধিতার কারণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির হওয়ার সময় জশুয়া-কে আগের তুলনায় বেশ রোগা দেখাচ্ছিল। তিনি গাঢ় নীল রঙের ফুলহাতা শার্ট এবং খাকি প্যান্ট পরেছিলেন। বিচারক যখন সাজার কারণগুলো বর্ণনা করছিলেন, তখন তিনি মাঝে মাঝে নোট নিচ্ছিলেন এবং গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শকদের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছিলেন। আদালতের বাইরে দীর্ঘ সময় ধরে শত শত মানুষ তার রায়ের অপেক্ষায় ভিড় করেছিলেন এবং সেখানে পুলিশের ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল।




