চীন, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের সমন্বয়ে একটি ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপনের চীনা প্রস্তাবের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। বৃহস্পতিবার দুপুরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংকে বিদায় জানানোর পর সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এই কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রীর মতে, এই করিডোরটি দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি নতুন সংযোগ পথ হিসেবে কাজ করবে, যা পণ্য ও মানুষের যাতায়াত বৃদ্ধি করবে এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগকে আরও শক্তিশালী করবে।

এই প্রস্তাবের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে হুমায়ুন কবির বলেন, আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীলতা আনতে এই করিডোর সহায়ক হবে, যা পরোক্ষভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান এবং ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, যা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব হবে। ভূ-রাজনৈতিক শঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এটি একটি উন্নয়নের প্রকল্প এবং এর ফলে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষই উপকৃত হবে, তাই এখানে শঙ্কার কিছু নেই।

প্রস্তাবিত এই করিডোরটি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর একটি অংশ। এর পরিকল্পনা অনুযায়ী, চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে এই পথটি বিস্তৃত হবে। সেখান থেকে একদিকে ইয়াঙ্গন এবং অন্যদিকে রাখাইনের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত সংযোগ থাকবে। এরপর সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সাথে যুক্ত হবে। এর আগে নব্বইয়ের দশকে ভারতসহ চার দেশের সমন্বয়ে বিসিআইএম (BCIM) করিডোরের প্রস্তাব থাকলেও ভারতের আপত্তির কারণে তা স্থবির হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ভারতকে বাদ দিয়ে চীন এই নতুন ত্রিদেশীয় পরিকল্পনা সামনে আনে। গত জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বেইজিং এই প্রস্তাবটি পুনরায় উত্থাপন করে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বন্দর, রেলওয়ে, সড়ক এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে চীনা বিনিয়োগ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে এবং পরিবহন খরচ ও সময় কমে আসায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়বে। এছাড়া লজিস্টিক হাব তৈরির মাধ্যমে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

এদিকে, ঢাকা সফরকালে লিউ হাইশিং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ-চায়না সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্নেন্স স্টাডিজ উদ্বোধন করেন এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে এক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন। এছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। জাতীয় জাদুঘর এবং শামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজ পরিদর্শনের পাশাপাশি তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সাথে তার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা হয় এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের সমর্থন অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানানো হয়।