ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যৌথভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য নিজ নিজ সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের শতাধিক সাবেক শীর্ষ কূটনীতিক। তাঁদের মতে, দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসী পদক্ষেপ একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। গত শনিবার ফরাসি দৈনিক ল্য মঁদ-এ প্রকাশিত এক যৌথ খোলা চিঠিতে এই আহ্বান জানানো হয়।

চিঠিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এবং ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি উভয় পক্ষের নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ২০২৫ সালে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া দুই দেশটির সেই অবস্থানকে এখন কেবল কাগুজে ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তরের তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।

এই চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত জেরেমি গ্রিনস্টক ও এমির জোন্স প্যারি, ফ্রান্সের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক পরিচালক ইভ অবিন দে লা মেসুজিয়ের এবং ডেনিস বোচার্ডের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।

চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা এবং ইসরায়েলি বাহিনীর নিষ্ক্রিয় সমর্থনে উগ্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের চরম সহিংসতা জাতিগত নিধনের শামিল। ফলে আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলকে আর প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হচ্ছে না বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।

ইরান, কাতার ও ইয়েমেনে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাস হপটন আল-জাজিরাকে জানান, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের সাম্প্রতিক তৎপরতার প্রেক্ষিতেই এই চিঠি প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর মতে, ইসরায়েল সরকার এমনভাবে নতুন বসতি স্থাপনের কৌশল নিচ্ছে যার ফলে ভবিষ্যতে পশ্চিম তীরে কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অবকাশই থাকবে না।

গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগটি এল। গত বছর অক্টোবরে হামাসের সাথে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হলেও ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির পর থেকেও অন্তত ১ হাজার ২৮৫ জন ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন।

লিবিয়ায় নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার মিলেট আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এই চিঠির উদ্দেশ্য কেবল নিন্দা জানানো নয়, বরং কঠোর বাস্তব পদক্ষেপ দাবি করা। তিনি বলেন, গত কয়েক মাস ধরেই মন্ত্রীরা কেবল বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু এখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ এবং গাজায় মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে।

চিঠিতে ইসরায়েলি বসতিগুলোর সাথে বাণিজ্য বন্ধ, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বিদেশি নাগরিকদের সম্পত্তি ক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইউএনআরডব্লিউএ-সহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, গাজায় সাংবাদিক, কূটনীতিক ও আইনপ্রণেতাদের নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও লেবাননে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাবেক কূটনীতিকেরা মন্তব্য করেন, এই অঞ্চলের বর্তমান সীমানা নির্ধারণে তাঁদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

মিলেট আরও জানান, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের জর্ডান নদী পেরিয়ে জর্ডানে চলে যেতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই আহ্বানে সাড়া দেবেন কিনা সে বিষয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করলেও জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইসরায়েলের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে সক্ষম।