পূর্ব কঙ্গোর দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো সরকারের প্রতিনিধিদল এবং রুয়ান্ডা-সমর্থিত এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে সুইজারল্যান্ডে পাঁচ দিনব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে জানায়, তারা “ব্যাপক শান্তি ও সংঘাত সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখার” প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে, যা চলমান হিংসা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই রোডম্যাপটি ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত একটি শান্তি কাঠামোর আওতায় আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সময়সূচি নির্ধারণ করে। যদিও ওই চুক্তি স্বাক্ষরের পরও পূর্ব ডিআর কঙ্গোর বিভিন্ন অঞ্চলে লড়াই অব্যাহত ছিল এবং কয়েক দশক ধরে চলা সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত ও লক্ষ লক্ষ বেসামরিক নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। নতুন রোডম্যাপে পর্যায়ক্রমিক পদক্ষেপ ও নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে; পাশাপাশি উভয় পক্ষ “নমনীয়তা ও সৃজনশীলতার” প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকার কথা জানিয়েছে, যাতে অচলাবস্থা কাটিয়ে এগোনো যায়।

তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে এখনো মতবিরোধ রয়ে গেছে। এম২৩-এর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের সঠিক সময়সূচি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে এখনো ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এই বিষয়গুলো ভবিষ্যতের আলোচনা ও চুক্তির কার্যকারিতার জন্য নির্ণায়ক হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এই আলোচনায় এম২৩, ডিআর কঙ্গো সরকার, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র, টোগো প্রজাতন্ত্র, আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশন এবং আয়োজক দেশ সুইজারল্যান্ডের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, “দোহা ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট”-এর অধীনে দায়বদ্ধতা ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা গঠন করা হবে, যা ২০২৫ সালের চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পক্ষগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণের জন্যও একটি পৃথক ব্যবস্থা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এর সচিবালয় স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রথম যাচাই মিশন আগামী সোমবার মিনেম্বোয়ে এলাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মিনেম্বোয়ে দক্ষিণ কিভুর একটি অঞ্চল, যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র সংঘর্ষ চলছিল। যদিও বারবার যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, উত্তর ও দক্ষিণ কিভুতে লড়াই এখনো থামেনি। উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলছে, যা শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।

এই সংঘাতের মূলে ডিআর কঙ্গো ও প্রতিবেশী রুয়ান্ডার মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কাজ করছে। রুয়ান্ডা দাবি করে আসছে, ডিআর কঙ্গো সরকার রুয়ান্ডার মুক্তির জন্য গণতান্ত্রিক বাহিনী (এফডিএলআর) নামে পরিচিত সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে ভেঙে ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে, যা কিগালির জন্য নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে, ডিআর কঙ্গো এফডিএলআরকে সমর্থনের অভিযোগ অস্বীকার করে এবং পাল্টা অভিযোগ করে যে, রুয়ান্ডা এম২৩-কে সেনা ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই সংঘাত আরও তীব্র রূপ নেয়, যখন এম২৩ পূর্ব ডিআর কঙ্গোর বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে, যার মধ্যে গোমা শহর এবং দুটি বিমানবন্দরও ছিল। কয়েক দশক ধরে চলা এই লড়াইয়ে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং লক্ষ লক্ষ বেসামরিক নাগরিক ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। পূর্ব ডিআর কঙ্গো কোল্টানসহ বিশ্বব্যাপী ইলেকট্রনিক্স শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ, যা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

রুয়ান্ডা বরাবরই এম২৩-কে সমর্থনের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে, যদিও এর পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। কিগালি বলেছে, এই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি কেবল প্রতিরক্ষামূলক এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হুমকি মোকাবিলার জন্যই সীমিত। এই অবস্থানের কারণে শান্তি প্রক্রিয়ায় আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা নতুন রোডম্যাপ বাস্তবায়নের সময় আরও স্পষ্ট হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা একটি কাঠামোবদ্ধ শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও, মাঠ পর্যায়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি, রাজনৈতিক সংস্কারের সময় নির্ধারণ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের মতো জটিল বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। মিনেম্বোয়েতে শুরু হতে যাওয়া যাচাই মিশন এই প্রক্রিয়ার প্রথম বাস্তব পরীক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে।