মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ৯৩৮ জন ধনকুবের রয়েছেন, যাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮.২ ট্রিলিয়ন ডলার। এই বিশাল সম্পদ ও দেশের ক্রমবর্ধমান জাতীয় ঋণের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক এবং মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স (আই-ভিটি) সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। উভয়েই একই অঙ্ক ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে যুক্তি উপস্থাপন করলেও তাদের প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।

চলতি বছরের প্রথম দিকে সিনেটর স্যান্ডার্স প্রতিনিধি রো খান্না (ডি-কালিফোর্নিয়া) সঙ্গে মিলে “মেক বিলিয়নেয়ারস পে দেয়ার ফেয়ার শেয়ার অ্যাক্ট” নামে একটি বিল উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবে বছরে ৫ শতাংশ হারে কর আরোপের কথা বলা হয়েছে, যা কার্যকর হবে ১০০ কোটি ডলার বা তার বেশি সম্পদের মালিকদের ওপর। স্যান্ডার্সের অনুমান, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে প্রথম দশ বছরে মোট ৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার রাজস্ব সংগ্রহ সম্ভব হবে।

এই রাজস্ব ব্যয়ের পরিকল্পনাও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম বছরের আয় থেকে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রত্যেককে এককালীন ৩,০০০ ডলারের চেক দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বার্ষিক ১,৫০,০০০ ডলার বা তার কম আয়ের পরিবার—যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ শতাংশ—এই সুবিধার আওতায় আসবে। পরবর্তী সময়ে এই তহবিল থেকে মেডিকেইড ও অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের আওতায় ১.১ ট্রিলিয়ন ডলারের কাটছাঁট পূরণ, সরকারি স্কুল শিক্ষকদের জন্য ৬০,০০০ ডলারের ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ এবং কর্মজীবী অভিভাবকদের শিশু যত্ন ব্যয় তাদের আয়ের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এক বিবৃতিতে স্যান্ডার্স বলেন, “অভূতপূর্ব আয় ও সম্পদের বৈষম্যের এই সময়ে এই আইন আমেরিকার ধনকুবের শ্রেণির কাছে ন্যায্য কর দাবি করছে, যাতে আমরা সবার জন্য কার্যকর অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারি, কেবল ১ শতাংশের জন্য নয়।” তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, ঋণ সংকট ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি—এই দুটি সমস্যা একে অপরের সঙ্গে একাকার নয়। একটি সমাধানের জন্য অন্যটিকে উপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, ৩,০০০ ডলারের একটি চেক জাতীয় ঋণের বোঝা কমাবে না, কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির চাপে জর্জরিত একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিক ও বাস্তবসম্মত স্বস্তি এনে দিতে পারে।

অন্যদিকে, ইলন মাস্ক ২০২৩ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছিলেন যে, আমেরিকার সব ধনকুবেরের সম্পদের ১০০ শতাংশ কর আদায় করলেও জাতীয় ঋণের সামান্য অংশও কমবে না। তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং অবশেষে সরকারকে সকল নাগরিকের ওপর কর আরোপ করতে হবে এই ঋণ পরিশোধের জন্য। মাস্কের বিশ্লেষণে, ঋণের এই সংকট গভীরভাবে কাঠামোগত; দশকের পর দশক ধরে সরকারি ব্যয় আয়ের চেয়ে বেশি হওয়ায় এটি সৃষ্টি হয়েছে। কোনো একক কর ব্যবস্থা এই সমস্যার মূলোৎপাটন করতে সক্ষম নয়। তিনি আরও সতর্ক করেছেন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না এলে আমেরিকা “১০০০ শতাংশ” দেউলিয়া হওয়ার পথে এগোচ্ছে। গত পাঁচ বছরে একাই জাতীয় ঋণ ১১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বছরে প্রায় ১০ লাখ কোটি ডলার—অর্থাৎ ১ ট্রিলিয়ন ডলার—কেবল ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় করছে। পাঁচ বছরে এই পরিমাণ প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটি এখন মেডিকেয়ার ব্যয়ের চেয়েও বেশি। কমিটি ফর এ রেসপন্সিবল ফেডারাল বাজেটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে এই সুদ পরিশোধের পরিমাণ ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ কারণে দেশটি এখন ধার করা টাকার সুদ মেটানোর জন্য নতুন করে ঋণ নিচ্ছে—যা একটি ত্বরিত ও ঝুঁকিপূর্ণ চক্রের দিকে ইঙ্গিত করে।

মাস্কের যুক্তির মূল ভিত্তি হলো ধনকুবেরদের করকে ঋণ হ্রাসের হাতিয়ার হিসেবে দেখা। সেই মাপকাঠিতে এটি ব্যর্থ। কিন্তু স্যান্ডার্সের দৃষ্টিতে এটি একটি সম্পদ পুনর্বণ্টনের প্রক্রিয়া—যার মাধ্যমে কর্মজীবী নাগরিকদের হাতে নগদ অর্থ ফিরে আসবে এবং সামাজিক সেবার তহবিল শক্তিশালী হবে। ৫ শতাংশ বার্ষিক কর দশ বছরে ৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার জোগাতে সক্ষম—যা ঋণের তুলনায় ছোট হলেও সামাজিক খাতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। মাস্ক ও স্যান্ডার্সের এই দ্বন্দ্ব তাই শুধু করের হার নিয়ে নয়, বরং সরকারের ভূমিকা, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অগ্রাধিকার নিয়ে একটি গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কের প্রতিফলন।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ ফর্চুন ডটকম-এ প্রকাশিত হয়েছিল। ধনকুবেরদের ওপর কর আরোপের সম্ভাব্যতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে, বিশেষ করে বিভিন্ন রাজ্যে নতুন কর প্রস্তাব ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্পদ করের ভবিষ্যৎ নিয়ে।