ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নবগঠিত জাতীয় কমিটির প্রথম বৈঠকেই তরুণ ভোটারদের আকর্ষণে নতুন রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৈরি করা পরিকল্পনা অনুযায়ী, দলটি এখন থেকে একতরফা বক্তৃতার বদলে সরাসরি আলোচনায় বসবে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে।

এই পরিবর্তনের পেছনে একটি বড় কারণ হলো ভোটাধিকার। আজ যারা ১৬-১৭ বছরের বয়সসীমায়, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তারাই প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পারবেন। সেজন্য জেন-জি ছাড়াও জেন আলফাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। ৬৫ সদস্যের জাতীয় দলের সভায় সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের নেতৃত্বে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে শীর্ষ নেতারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এতদিন নেতারা কেবল কর্তব্যের কথা শুনিয়ে এসেছেন। এখন থেকে সেই পদ্ধতি বদলে যাবে। নতুন প্রজন্মের প্রশ্ন, অভিযোগ ও দাবির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে নেতাদের। কোনো নির্দেশ ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এই সংলাপের মাধ্যমে যুবসমাজের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে বিজেপি।

এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) সতর্কবার্তা। অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপট্টনমে অনুষ্ঠিত সংঘ পরিবারের সমন্বয় সভায় নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, তরুণদের মধ্যে হতাশা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ধারাবাহিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্বের ঊর্ধ্বগতি এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে সরকারের প্রতি তাদের বিশ্বাস কমে যাচ্ছে। সংঘ প্রধান মোহন ভাগবত বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে জানিয়েছেন, সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, আর দলকে নতুন চিন্তায় পরিচালিত হতে হবে।

তবে কেবল ‘ভুল সংশোধন’ নয়, একই সঙ্গে বিরোধীদের দমনের পথেও হাঁটছে বিজেপি। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির মোকাবিলায় দলটি আইনের পাশাপাশি সরাসরি প্রতিরোধের উপর জোর দিচ্ছে। স্বাধীনতা দিবসের পর থেকে সিজেপি ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি শুরু করেছে। দলীয় কর্মীরা রাজ্যে রাজ্যে সরকারি স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষার মান, অবকাঠামো ও শিক্ষকের উপস্থিতি যাচাই করছেন। কিন্তু বিজেপি এই কার্যক্রমকে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা হিসেবে দেখছে।

ফলে সিজেপি নেতাদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে। কোথাও তাদের গাড়িতে আক্রমণ, কোথাও স্কুলে প্রবেশে বাধা, আবার কোথাও অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে মামলা। রাজস্থানের এক গ্রামে সিজেপির শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাংকাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কলকাতায় মিলনায়তনের ভাড়া বাতিল করা হয়েছে। মহারাষ্ট্রের লাতুর জেলায় নেতা অভিজিৎ দিপকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে, যেখানে অভিযোগ—বিনা অনুমতিতে স্কুলে ঢুকে শিক্ষকদের কাজে বাধা দিয়েছেন তিনি।

দলের কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, সংলাপ জরুরি হলেও সিজেপিকে হতোদ্যম করাও প্রয়োজন। তাদের মতে, এমন কিছু করতে দেওয়া যাবে না যা সমাজে অরাজকতার জন্ম দেয়। ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচিকে তারা নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধেও ‘নৈরাজ্য সৃষ্টির’ অভিযোগ তুলেছে বিজেপি। গত ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে পুলিশের ছররা গুলিতে ১৯ বছরের তরুণ সাহিল লোচাবের একটি চোখের দৃষ্টি হারানোর ঘটনা ঘটে। পুলিশ প্রথমে এফআইআর নিতে অস্বীকার করলে রাহুল গান্ধী সাহিল ও তার মাকে নিয়ে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে ধরনায় বসেন। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, জয়রাম রমেশসহ বহু নেতা সেখানে যোগ দেন। সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য হয়। সাবেক বিজেপি সভাপতি জে পি নাড্ডা ও রবিশংকর প্রসাদ রাহুলের এই পদক্ষেপকে অগণতান্ত্রিক ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী বলে সমালোচনা করেছেন।

তবে রাহুল থেমে যাননি। ‘ছাত্র কি গুঞ্জ’ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন তিনি। গত শনিবার মহারাষ্ট্রের পুনেতে তার সমাবেশে জেন-জি ও জেন আলফার বিপুল উপস্থিতি দেখা গেছে। স্থানীয় প্রশাসনের বাধা সত্ত্বেও এই ভিড় বিজেপির জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ। সুতরাং, যুবসমাজের মনোবল ফিরে পেতে সংলাপের উদ্যোগকে দলীয় নেতৃত্ব এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যাতে বিরোধী শিবিরের দিকে তরুণদের ঝুঁকে পড়ার সুযোগ কমে।