উত্তরাঞ্চলের ধান-চাল উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র নওগাঁয় এবার আউশ ধানের ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু সেই আনন্দ মুখে নেই চাষিদের। বাজারে ধানের দর এতটাই নিম্নমুখী যে উৎপাদন ব্যয়ও তুলতে পারছেন না তাঁরা। জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা গেছে, জিরাশাইল, কাটারি ও ব্রি-২৮ জাতের প্রতি মণ ধান ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় প্রতি মণে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কম দাম পাচ্ছেন কৃষক। অথচ সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে অনেকটাই।
মহাদেবপুর উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বুধবার উপজেলা সদরের হাটে ১০ মণ জিরাশাইল ধান বিক্রি করতে এসেছিলেন। মলিন মুখে তিনি বলেন, 'দাম শুনে কী হবে? কাগজে-পত্রিকায় যতই লেখা হোক, আমাদের কষ্ট কেউ বোঝে না। প্রতি মণ ধান ৩০ টাকা ভ্যানভাড়া দিয়ে বাজারে আনছি। না বিক্রি করে ফেরত নিয়ে গেলে আরও ৩০ টাকা ভাড়া গুনতে হতো। তাই বাধ্য হয়ে প্রতি মণ ৮৮০ টাকায় ধানটা বিক্রি করে দিলাম। গত বছর তো প্রতি মণ আউশ ধান ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করেছি।' একই দিনে নিয়ামতপুর উপজেলার ছাতড়া হাটে ধান বিক্রি করতে এসেছিলেন গোবিন্দপুর গ্রামের সেলিম হোসেন। তিনি জানান, তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আউশ ধান চাষ করেছেন, এর জন্য সমিতি থেকে ঋণও নিয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তাঁর। ধানের দাম কমে যাওয়ায় ঋণ শোধ ও সংসার চালানো নিয়ে এখন চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে ৫১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৫৭৩ হেক্টরে। প্রতি একরে ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয় ৬৪ হাজার টাকা, অর্থাৎ বিঘাপ্রতি প্রায় ২১ হাজার টাকা। নওগাঁ সদর, মহাদেবপুর, মান্দা ও নিয়ামতপুর উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রমিকের মজুরি, সার, সেচ ও জমি প্রস্তুতিতে প্রতি বিঘায় ২০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। প্রতি বিঘায় ফলন হয় ২০ থেকে ২২ মণ। প্রতি মণ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করলে বিঘাপ্রতি আয় দাঁড়ায় ১৭ থেকে ১৯ হাজার টাকা, যা খরচের তুলনায় অনেক কম। ধান ঘরে তোলার পরপরই পারিবারিক প্রয়োজন ও ঋণ পরিশোধের চাপে কম দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।
ছাতড়া বাজারের মেসার্স রেখা ধান আড়তের স্বত্বাধিকারী শহিদুল ইসলাম জানান, বাজারে ধানের দর ক্রমেই পড়ছে। দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণ ধানের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা কমেছে। আউশ ধান আসার পর থেকেই এই পতন। বর্তমানে কাটারি ধান প্রতি মণ ৯০০ থেকে ৯৬০ টাকা, জিরাশাইল ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা এবং ব্রি-২৮ জাতের ধান ৮০০ থেকে ৮২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি একরে আউশ ধান উৎপাদনে গড় খরচ হয়েছে ৬৪ হাজার টাকা। এ অবস্থায় প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হলে কৃষকের লাভ থাকত। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।
ধানের দাম কমলেও স্থানীয় চালের বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। নওগাঁর চালকল মালিকদের মতে, গত বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অতিরিক্ত চাল আমদানির কারণে দেশে পর্যাপ্ত চালের মজুত রয়েছে। ফলে কারখানাগুলোতে চালের বিক্রি কমে গেছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় মিলাররা ধান কেনাও কমিয়ে দিয়েছেন। নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা হয়, যার ফলে দেশীয় চালের চাহিদা কমে গেছে। এই প্রভাব আমনের ভরা মৌসুমেও থাকবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সেটি হলে আমন মৌসুমেও কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।



