দেশের এলপিজি বাজারে সরকারের অংশীদারিত্ব নগণ্য — মাত্র ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বাকি প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। এই নির্ভরতা কমানো এবং সংকটের সময় বাজারে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা তৈরি করতে গত জানুয়ারিতে সরাসরি এলপিজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। কিন্তু সাত মাস পেরিয়ে গেলেও সেই উদ্যোগ থেকে ফল আসেনি — এক টন এলপিজিও আমদানি করতে পারেনি সংস্থাটি।
এই সময়ে মোট পাঁচ দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল — ফেব্রুয়ারিতে দুই দফা এবং জুলাইয়ে তিন দফা। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানই গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব দেয়নি। বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, আগ্রহী সরবরাহকারীদের মধ্যে কেউ কেউ অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দাবি করায় আলোচনা ভেস্তে যায়। যেমন সৌদি আরামকোর চুক্তিমূল্যের ওপর প্রতি টনে ২৭০ ডলার প্রিমিয়াম চেয়েছিল একটি প্রতিষ্ঠান, যা বিপিসি অলাভজনক মনে করে প্রত্যাখ্যান করে।
পাঁচ দফা দরপত্র ব্যর্থ হওয়ার পর সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ৫ হাজার টন এলপিজি কেনার সিদ্ধান্ত নেয় বিপিসি। এতে মোট খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। স্পিড মার্কেটিং করপোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর আগস্টের চুক্তিমূল্যের সঙ্গে প্রতি টনে ৯৭ ডলার প্রিমিয়ামে এলপিজি সরবরাহে সম্মত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গত বৃহস্পতিবার কার্যসম্পাদন জামানত জমা দিলেও এখনো চুক্তি স্বাক্ষর এবং এলসি খোলার কাজ বাকি। ফলে কবে এলপিজি দেশে পৌঁছাবে, তা নিশ্চিত নয়।
এদিকে ব্রাদার্স এলপিজি নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানও এলপিজি সরবরাহে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিপিসির বোর্ডে তাদের প্রস্তাবের অনুমোদন হলেও সরকারি স্তরে এখনো অনুমোদন মেলেনি। বিপিসির চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম প্রধান জানান, দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই আলোচনা চলছে এবং শিগগিরই আমদানি শুরু হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও মোংলায় এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের চেষ্টাও চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
২০১৫ সালে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ হওয়ার পর রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে। লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০০ শতাংশ, ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ শতাংশে। বর্তমানে বছরে দেশে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন এলপিজি সরবরাহ হয়, যার প্রায় ৮০ শতাংশই যায় গৃহস্থালির রান্নায়। তবে এই বিশাল বাজারের প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে।
দামের হিসাবেও ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২০ সালে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল প্রায় ৯০০ টাকা। ২০২১ সালের মে থেকে বিইআরসি দাম নির্ধারণ করে দিলে সে সময় সিলিন্ডারের দাম ছিল ৮৪২ টাকা। কিন্তু ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে দাম বাড়তে থাকে। গত ডিসেম্বরে তীব্র সংকটে কোনো কোনো এলাকায় সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছিল তিন হাজার টাকায়ও।
এ অবস্থায় কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম মনে করেন, বিপিসির এলপিজি আমদানি প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা জরুরি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু একবার আমদানি করলেই বাজারে সরকারের কার্যকর উপস্থিতি তৈরি হবে না। বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডের সক্ষমতা বাড়িয়ে নিয়মিত আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি নিজস্ব আমদানি, সংরক্ষণ ও বোতলজাত করার অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তিনি আরও বলেন, এলপিজির বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর, তাই সরকারের বিকল্প উৎস তৈরি হলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ভোক্তারা উপকৃত হবেন।




