মক্কার তৎকালীন অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এক ঐতিহাসিক বাণিজ্য যাত্রার সূচনা হয়েছিল ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে। প্রথম শাম সফরের প্রায় তেরো বছর পর, পঁচিশ বছর বয়সে মুহাম্মদ (সা.) দ্বিতীয়বারের মতো সিরিয়ার পথে রওনা হন—কিন্তু এবার চাচা আবু তালিবের সঙ্গী হিসেবে নয়, বরং মক্কার প্রতিষ্ঠিত ধনী নারী ব্যবসায়ী খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদের কাফেলার প্রতিনিধি হিসেবে। ততদিনে সততা ও আমানতদারির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ‘আল-আমিন’ ও ‘আস-সাদিক’ উপাধিতে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন।
মক্কায় তখন তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা ও খরা বিরাজ করছিল। আবু তালিবের আর্থিক অবস্থা দিন দিন শোচনীয় হয়ে পড়ায় তিনি ভাতিজাকে ডেকে বলেন, পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়েছে এবং খাদিজার একটি কাফেলা শামের উদ্দেশে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বিশ্বস্ত লোক খুঁজছেন, আর মুহাম্মদের সততার সুনামের কারণে তিনি নিশ্চিতভাবেই অগ্রাধিকার পাবেন। তৎকালীন আরব সমাজে নারীরা দূরপাল্লার বাণিজ্যে সরাসরি অংশ নিতেন না; প্রচলিত ‘মুদারাবা’ রীতিতে পুঁজি বিনিয়োগকারীর এবং শ্রম ও দক্ষতা প্রতিনিধির মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালিত হতো। মুনাফা নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগ করা হতো। খাদিজার কানে ইতিমধ্যে তরুণ মুহাম্মদের সততার খ্যাতি পৌঁছেছিল এবং তিনি আবু তালিবের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠান। পারিশ্রমিকের অঙ্ক নিয়ে বর্ণনায় ভিন্নতা থাকলেও—কোথাও দুটি উট, কোথাও লাভের অংশ, আবার কোথাও প্রচলিত পারিশ্রমিকের দ্বিগুণ বলা হয়েছে।
যাত্রার জন্য খাদিজা তাঁর অভিজ্ঞ কর্মচারী মাইসারাকে সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন। মক্কা থেকে উত্তরমুখী প্রাচীন বাণিজ্যপথ ধরে মদিনা, খাইবার, ওয়াদিউল কুরা, তাইমা ও তাবুক হয়ে কাফেলা পৌঁছায় রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্ত নগরী বুসরা আল-শামে। সিরাতের কালপঞ্জি ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী এই সফর সম্পন্ন হয় ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে, যখন নবীর বয়স ছিল পূর্ণ ২৫ চন্দ্রবছর। কোরাইশদের ঐতিহ্যবাহী গ্রীষ্মকালীন কাফেলা মক্কা ত্যাগ করত সাধারণত বসন্তের শেষভাগে, অর্থাৎ মে-জুন মাসে। মক্কা থেকে বুসরা পর্যন্ত দূরত্ব বিভিন্ন রুটে ১,৩০০ থেকে ১,৬০০ কিলোমিটার, ঐতিহাসিক বর্ণনায় ‘প্রায় ১,৩৫০ কিলোমিটার’ উল্লেখ রয়েছে। দৈনিক এক মারহালাহ গতিতে একমুখী যাত্রায় সময় লাগত প্রায় এক মাস, আর কেনাবেচা ও ফেরার পথ মিলিয়ে সমগ্র সফরে সময় লাগে আড়াই থেকে তিন মাস।
বুসরায় পৌঁছে মুহাম্মদ (সা.) একটি গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেন। সেই গাছের কাছেই বাস করতেন নাসতুর নামের এক সন্ন্যাসী। প্রথম শাম সফরের পাদ্রি বাহিরার ঘটনা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এই বিবরণ একাধিক স্বাধীন সূত্রে সংরক্ষিত। নাসতুর গির্জা থেকে নেমে এসে মাইসারাকে জিজ্ঞেস করেন গাছের নিচে বিশ্রামরত যুবকটি কে। মাইসারা বলেন, তিনি মক্কার হারাম সীমানার বাসিন্দা, কুরাইশ বংশীয় সম্মানিত যুবক। নাসতুর জানান, নবী ইসার পর থেকে এই গাছের নিচে আর কোনো নবী ছাড়া কেউ বসেননি। তিনি তরুণের চোখে একধরনের লালচে আভা লক্ষ করেন, যা প্রাচীন সেমেটিক ধর্মগ্রন্থে নবুয়তের চিহ্ন বলে উল্লেখ আছে। তবে হাদিসশাস্ত্রে এই বর্ণনা সমালোচনামূলক পর্যালোচনার মুখোমুখি। মূলত ইবনে ইসহাক ও ওয়াকিদির সূত্রে এসেছে, আর অধিকাংশ সনদ ‘মুরসাল’ বা ‘মুনকাতি’। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ও ইমাম জাহাবি মন্তব্য করেছেন, ঘটনার মূল কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও কিছু বিস্তারিত উক্তি পরবর্তী বর্ণনাকারীদের স্মৃতিনির্ভর সংযোজন হতে পারে।
বুসরার বাজারে দরকষাকষির এক পর্যায়ে এক ক্রেতা মুহাম্মদ (সা.)-কে আরবের প্রচলিত রীতিতে মক্কার প্রধান দুই দেবী লাত ও উজ্জার নামে শপথ করতে বলেন। তিনি স্পষ্ট জবাব দেন, জীবনে কখনোই সেই দুই দেবতার নামে শপথ করেননি এবং পথ চলার সময়ও সেগুলোর সামনে দিয়ে যেতে হলে মুখ ফিরিয়ে পাশ কাটিয়ে যান। এই দৃঢ়তা দেখে ক্রেতা মুগ্ধ হয়ে তাঁর কথা মেনে নেন এবং মাইসারার কাছে মন্তব্য করেন, এই ব্যক্তি কোনো সাধারণ মানুষ নন—ইনি সেই ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব, যাঁর কথা ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত রয়েছে। বাণিজ্যিক স্বার্থের মুহূর্তেও পৌত্তলিক আচার থেকে এই সচেতন দূরত্ব নবুয়তপূর্ব জীবনেও তাঁর স্বতন্ত্র নৈতিক অবস্থানের নজির।
প্রাক-ইসলামী যুগে হেজাজ থেকে রোমান সাম্রাজ্যে মূলত ইয়েমেনি ও মাক্কী প্রক্রিয়াজাত চামড়া, উৎকৃষ্ট পশম ও লোমজাত বস্ত্র, রৌপ্য ও ধাতব বার এবং ইয়েমেনের বিখ্যাত সুগন্ধি ও লোবান রপ্তানি হতো। রোমান সাম্রাজ্যের অভিজাত শ্রেণি ও বিশাল সেনাবাহিনীর মধ্যে চামড়াজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল। কোরাইশদের প্রক্রিয়াজাত চামড়া আন্তর্জাতিক বাজারে টেকসই গুণমানের জন্য শীর্ষস্থানীয় ছিল। বিনিময়ে শাম থেকে হেজাজে আনা হতো সিরীয় মিহি রেশম ও সুতি বস্ত্র, জলপাই তেল, বিভিন্ন ফলের মিষ্টি রস, গম, ময়দা এবং রোমান ধাতব অস্ত্র ও কাচপাত্র। মক্কার অনুর্বর মাটিতে কৃষিকাজ না হওয়ায় খাদ্যশস্য ও বিলাসবহুল বস্ত্রের জন্য কোরাইশরা পুরোপুরি শামের আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, কোরাইশদের সমগ্র যৌথ কাফেলায় যত পণ্য থাকত, তার প্রায় সমপরিমাণ পণ্য থাকত খাদিজার একক মালিকানাধীন। মুহাম্মদ (সা.) অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে অন্য সব ব্যবসায়ীর আগেই আকর্ষণীয় মূল্যে কাফেলার চামড়া ও সুগন্ধি বিক্রি করে দেন এবং মক্কার স্থানীয় চাহিদার কথা মাথায় রেখে উচ্চমানের সিরীয় বস্ত্র ও জলপাই তেল ক্রয় করেন।
গোটা সফরে মাইসারা মুহাম্মদের লেনদেনের সততা, ধৈর্য ও আচরণের সৌজন্য গভীরভাবে লক্ষ করেন। ওজনে কম না দেওয়া, পণ্যের ত্রুটি গোপন না করা এবং ক্রেতার দুর্বলতার সুযোগ না নেওয়া ছিল তাঁর ব্যবসার মূলনীতি। ফেরার পথে প্রচণ্ড গরমে তিনি লক্ষ করেন, দুটি মেঘখণ্ড নিয়মিত তাঁর মাথার ওপর ছায়া দিয়ে চলছে। কাফেলা মক্কায় প্রবেশের সময় খাদিজা নিজেও গৃহের ছাদ থেকে দূর থেকে কাফেলাকে দেখতে পান। কাফেলা প্রবেশ করেছিল তীব্র গরমের এক দ্বিপ্রহরে, আর অগ্রভাগে উটের পিঠে মুহাম্মদকে তিনি দূর থেকে প্রত্যক্ষ করেন—মাইসারার বর্ণনার আগেই নিজের চোখে দেখেন সেই অতিপ্রাকৃত ছায়া।
বুসরার ব্যবসা শেষে দেখা যায়, খাদিজা আগের যেকোনো সফরের তুলনায় বেশি মুনাফা অর্জন করেছেন। মুহাম্মদ (সা.) সততার সঙ্গে সব হিসাব বুঝিয়ে দেন, আর মাইসারা খাদিজাকে নাসতুরের কথা ও সফরের খুঁটিনাটি বিস্তারিত জানান। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী, এই বিবরণ শুনে খাদিজা তাঁর জ্ঞাতিভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফালের সঙ্গে আলোচনা করেন, আর ওয়ারাকা মন্তব্য করেন, বর্ণনা সত্য হলে মুহাম্মদই হতে পারেন প্রতীক্ষিত সেই নবী।
খাদিজার আস্থা এক সফরেই তৈরি হয়নি। কিছু বর্ণনায় এসেছে, শাম সফরের আগে মুহাম্মদ (সা.) তিহামা অঞ্চলের বার্ষিক মেলা সুক্ব হুবাশাতেও খাদিজার পক্ষে বাণিজ্য করেছিলেন এবং ভালো মুনাফা নিয়ে ফেরেন। এ ছাড়া ইয়েমেন সীমান্তের ‘জুরাশ’ বাণিজ্যকেন্দ্রেও গিয়েছিলেন বলে কিছু বর্ণনায় রয়েছে। এই ছোট-বড় স্থানীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে ধীরে ধীরে প্রমাণিত হয় তাঁর ব্যবসায়িক দক্ষতা, যার ভিত্তিতেই খাদিজা তাঁকে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সফরের দায়িত্ব দিতে আস্থা পান।
দ্বিতীয় শাম সফর শুধু একটি সফল বাণিজ্যিক অভিযান ছিল না; এটি সেই সেতু, যা তরুণ মুহাম্মদ (সা.)-এর সততা ও বিচক্ষণতাকে খাদিজার আস্থার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়, আর সেই সূত্র ধরেই আসে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিবাহ।




