মদিনার বাতাস তখন উৎসবের আমেজে মুখরিত। দীর্ঘ ১৩ বছরের নির্যাতনের পর নবী করিম (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনার মাটিতে পা রাখেন। তাঁর আগমনের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে জনতা আনন্দে উদ্বেলিত হয়। এদিকে, তাওরাতের গভীর জ্ঞানে সমৃদ্ধ বনু কাইনুকা গোত্রের প্রধান ইহুদি পণ্ডিত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) মদিনায় নবীজির উপস্থিতির খবর পান। তিনি তাওরাতে আখেরি নবীর যে বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ ছিল, সেই গুণগুলো মক্কা থেকে আসা এই ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান কি না—তা যাচাই করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। সত্য অন্বেষণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তিনি নবীজির মুখমণ্ডল দেখে মুহূর্তেই নিশ্চিত হন যে, এটি কোনো মিথ্যাবাদীর মুখ হতে পারে না। পরে তিনি নিজেই এ অনুভূতির কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, ‘আমি তাঁর চেহারার দিকে তাকিয়েই অকাট্যভাবে বুঝে গিয়েছিলাম—এটা মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৮৫)
সেদিন নবীজি (সা.) জনতাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা সালামের বিস্তার ঘটাও, অনাহারীকে অন্ন দাও, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো এবং রাতের বেলা মানুষের গভীর ঘুমের সময় নামাজে দাঁড়াও; তাহলে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।’ এই বাণী শুনে আবদুল্লাহ ইবনে সালামের মন আরও বেশি আকৃষ্ট হয়। তবে পাণ্ডিত্যের প্রমাণ নেওয়ার জন্য তিনি এমন তিনটি প্রশ্ন করার সিদ্ধান্ত নেন, যার উত্তর সাধারণ মানুষের জানা সম্ভব নয়—কেবল আল্লাহর মনোনীত নবীই জানেন।
তিন প্রশ্নের মধ্যে প্রথমটি ছিল কিয়ামতের প্রথম বড় আলামত সম্পর্কে, দ্বিতীয়টি জান্নাতে প্রবেশের পর মুমিনদের প্রথম খাবার সম্পর্কে এবং তৃতীয়টি সন্তান পিতা-মাতার মধ্যে কার আকৃতি পায় তা নিয়ে। রাসুল (সা.) বললেন, এইমাত্র জিবরাইল (আ.) এসে এসব বিষয়ে অবহিত করে গেছেন। তারপর তিনি উত্তর দেন—প্রথমত, কিয়ামতের প্রথম নিদর্শন হলো এক সর্বগ্রাসী আগুন যা মানুষকে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে হাঁকিয়ে একত্রিত করবে। দ্বিতীয়ত, জান্নাতে প্রথম আপ্যায়নে মুমিনদের মাছের কলিজার সর্বোৎকৃষ্ট অংশ দেওয়া হবে। তৃতীয়ত, পিতা-মাতার মধ্যে যার বীর্য আগে প্রাধান্য পায়, সন্তান সেই আকৃতি ধারণ করে।
এসব উত্তর তাওরাতের গোপন সংবাদের সঙ্গে হুবহু মিলে যাওয়ায় আবদুল্লাহ ইবনে সালামের অন্তরের সংশয় দূর হয়ে যায়। তিনি বিনা দ্বিধায় উচ্চারণ করেন ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু’—অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসুল। তবে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি নবীজিকে (সা.) নিজ সম্প্রদায়ের কুটিলতা সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, ‘ইহুদিরা অত্যন্ত মিথ্যাবাদী জাতি। তারা যদি আমার ইসলাম গ্রহণের খবর আগে পেয়ে যায়, তাহলে আপনার কাছে আমার সম্পর্কে অপবাদ ছড়াবে। তাই আপনি আগে তাদের কাছে আমার মর্যাদা জিজ্ঞাসা করুন।’
রাসুল (সা.) তাঁর পরামর্শ মতো কাজ করেন। ইহুদি প্রতিনিধিদল আসলে তিনি জানতে চান আবদুল্লাহ ইবনে সালাম তাদের সমাজে কেমন ব্যক্তি। তারা তখন এককণ্ঠে প্রশংসা করে বলে, ‘তিনি আমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান।’ এরপর নবীজি প্রশ্ন করেন, ‘যদি তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে তোমাদের কী মত?’ তারা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে, ‘আল্লাহ তাঁকে এ কাজ থেকে রক্ষা করুন!’ ঠিক সেই সময় ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আবদুল্লাহ ইবনে সালাম উচ্চস্বরে ঘোষণা করেন—‘হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাওরাতে স্পষ্টভাবে লিখিত পেয়েছ, ইনি সেই রাসুল।’ তখন সত্যের বিরোধীরা তৎক্ষণাৎ তাঁকে ‘সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে এবং নানা অপবাদ রটায়। আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) নবীজিকে বলেন, ‘আমি আগেই এই আশঙ্কার কথা বলেছিলাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩২৯)
স্বজাতির অন্ধ গোঁড়ামি ও সামাজিক অবস্থান বিসর্জন দিয়ে সত্য গ্রহণের এই ঘটনা ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। দুনিয়াতেই তিনি জান্নাতের সুসংবাদ পান—এ ছিল তাঁর আত্মত্যাগের প্রতিদান।




