প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেমন হবে—তা নিয়ে ইসলামের দর্শন চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ। স্রষ্টার সৃষ্টি হিসেবে মাটি, পানি, অরণ্য ও প্রাণীজগৎকে বিবেচনা করা হয়েছে পবিত্র আমানত হিসেবে। মানুষের কর্তৃত্ব কখনোই অবাধ নয়; বরং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণই ইসলামের কাম্য।

ইসলামি জীবনদর্শনে পরিবেশভাবনার মূল ভিত্তি তিনটি শব্দে দাঁড়িয়ে—সংরক্ষণ, সমৃদ্ধি এবং স্থায়িত্ব। সংরক্ষণ বলতে বোঝানো হয় প্রকৃতির সম্পদ অপচয় রোধ করা এবং তা বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা। সমৃদ্ধি হলো উৎপাদনশীল শ্রম ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ বৃদ্ধি করা। আর স্থায়িত্ব হলো এই ধারা যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অক্ষুণ্ণ থাকে, তা নিশ্চিত করা—সাময়িক আবেগে সীমাবদ্ধ না রেখে।

পবিত্র কোরআনে উন্নয়ন ও নির্মাণের স্বাধীনতা দেওয়া হলেও প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী আছে। সুরা আ’রাফের ৭৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আদ জাতির পর আল্লাহ তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন এবং জমিনে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন; তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ করছ এবং পাহাড় কেটে ঘর বানাচ্ছ। সুতরাং আল্লাহর নেয়ামত স্মরণ করো এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না। অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বাধীনতা আছে, কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে কোনো উন্নয়ন ইসলাম সমর্থন করে না।

ইসলামি আইনের মূল লক্ষ্য বা ‘মাকাসিদে শরিয়াহ’র আলোকে পরিবেশ সুরক্ষা দুই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়—ইতিবাচক উদ্যোগে প্রকৃতির বিকাশ ঘটানো এবং ক্ষতির পথ বন্ধ করা। ইমাম আবু ইসহাক আশ-শাতিবি তাঁর ‘আল-মুওয়াফাকাত’ গ্রন্থে বলেছেন, শরিয়তের মূল ভিত্তি রক্ষার দুটি পথ—একটি হলো মূল স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ সুদৃঢ় রাখা (অস্তিত্বের সংরক্ষণ), অন্যটি হলো বর্তমান বা সম্ভাব্য ক্ষতি দূর করা (বিনাশ রোধ)।

সুরা সাজদার ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সর্বোত্তম রূপে তৈরি করেছেন। সুরা হিজরের ১৯-২০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, জমিনকে বিস্তৃত করা হয়েছে, তাতে পর্বতমালা স্থাপন করা হয়েছে এবং পরিমিত সবকিছু উৎপন্ন করা হয়েছে। মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং যাদের রিজিকদাতা মানুষ নয়, তাদের জন্যও।

রাসুল (সা.) সবুজায়নের ওপর অসাধারণ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যে মুসলিম একটি গাছ রোপণ করে বা ফসল ফলায়, তা থেকে পাখি, মানুষ বা চতুষ্পদ প্রাণী আহার করলে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয় (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০)। এমনকি কেয়ামত উপস্থিত হলেও যদি কারও হাতে চারাগাছ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে—এই নির্দেশনা এসেছে আল-আদাবুল মুফরাদে (হাদিস: ৪৭৯)। পতিত জমি আবাদ করার সামাজিক প্রণোদনাও দিয়েছেন—যে ব্যক্তি কারও মালিকানাধীন নয় এমন জমি আবাদ করবে, সে-ই তার সর্বাধিক হকদার (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৩৫)। তিনি আরও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, আরব ভূখণ্ড পুনরায় সবুজ চারণভূমি ও নদ-নদীতে পরিণত হবে (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৭)।

পরিচ্ছন্নতাকে ইসলাম ইমানের অঙ্গ বানিয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ইমানের সত্তরেরও বেশি শাখা রয়েছে; সর্বোত্তম হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫)। তিনি পাত্র ঢেকে রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, বছরের এমন একটি রাত আছে যখন মহামারি নেমে আসে, আর উন্মুক্ত পাত্রে সেই সংক্রমণ প্রবেশ করে (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০১৪)। তিরমিজির হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্রতা ভালোবাসেন; পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন। তাই আঙিনাগুলো পরিষ্কার রাখতে বলা হয়েছে (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭৯৯)। তৃতীয় খলিফা আলী (রা.) জনপথ ও উন্মুক্ত স্থানে ময়লা পানি বা পয়োনিষ্কাশনের নালা বের করা আইনত নিষিদ্ধ করেছিলেন (আব্দুর রাজ্জাক আস-সানআনি, আল-মুসান্নাফ)।

পানি উৎস, চলার পথ বা ছায়ার জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারীদের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাতের হুঁশিয়ারি এসেছে (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬)। যুদ্ধকালীন বিধানেও পরিবেশ সুরক্ষার চিত্র পাওয়া যায়। প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) সিরিয়াগামী সেনাদলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন—কোনো ফলবান বৃক্ষ কর্তন করবে না, শস্যক্ষেত বা খেজুরবাগান আগুনে জ্বালাবে না, খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া গবাদিপশু বধ করবে না এবং কোনো জনবসতি ধ্বংস করবে না (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক)।

আধুনিক যুগে পরিবেশ সংকট মোকাবিলায় ইসলাম ‘মাসালিহে মুরসালাহ’ বা বৃহত্তর জনকল্যাণমুখী নীতির কথা বলে। নদী দখলমুক্ত করা, কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য রোধ, একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ—এসব রাষ্ট্রীয় নীতিমালা মূলত এই নীতিরই প্রতিফলন। প্রকৃতিকে রক্ষা করা শুধু পরিবেশবাদী সংস্থার স্লোগান নয়; একজন বিশ্বাসীর কাছে এটি স্রষ্টার আমানত রক্ষার আত্মিক দায়। মাটি, পানি ও বাতাসের প্রতি মানবিক আচরণই নির্ধারণ করে আমরা নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় কতটা আন্তরিক। কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষের কৃতকর্মের কারণেই জলে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়েছে, যার ফলে তাদের কর্মের তিক্ত স্বাদ আস্বাদন করানো হয় (সুরা রুম, আয়াত: ৪১)। আরও বলা হয়েছে, পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না (সুরা আ’রাফ, আয়াত: ৫৬)।