মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত কেবল একটি স্থান পরিবর্তন ছিল না, বরং তা ছিল একটি আদর্শ সমাজ ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সূচনা। মদিনায় পৌঁছানোর পর মহানবী (সা.) বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষের মাঝে শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য চারটি মৌলিক ও গভীর মানবিক মূলনীতির কথা বলেন। এই বার্তাগুলো সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যক্তিগত আত্মিক উন্নতির এক অনন্য সমন্বয়।
মদিনার ইহুদি পণ্ডিত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম, যিনি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন, সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, রাসুল (সা.)-এর মদিনায় আগমনে বিপুল মানুষের ভিড় জমেছিল। তাঁর চেহারার দিকে তাকিয়েই ইবনে সালাম বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইনি কোনো মিথ্যাবাদী হতে পারেন না। সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.)-এর প্রথম দিককার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণীটি ছিল— ক্ষুধার্তদের অন্ন প্রদান করা, পারস্পরিক সালামের প্রসার ঘটানো, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং রাতের নিস্তব্ধতায় তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা। এই কাজগুলোর মাধ্যমেই জান্নাত লাভ ও শান্তি অর্জন সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৮৫)।
মহানবী (সা.)-এর এই নির্দেশনার প্রথম দিকটি ছিল ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মৌলিক চাহিদা পূরণ না হলে কোনো জাতি নৈতিকতা বা উন্নত সংস্কৃতির চর্চা করতে পারে না। পেটের ক্ষুধা ও অভাবই অপরাধ এবং সামাজিক সংঘাতের মূল কারণ। তাই একটি ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র গড়তে হলে সামাজিক সুরক্ষার ভিত্তি হিসেবে অন্নসংস্থান নিশ্চিত করাকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি সালামের প্রসারের কথা বলেন। পরিচিত বা অপরিচিত নির্বিশেষে একে অপরকে অভিবাদন জানানো পারস্পরিক হৃদ্যতা ও আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করে। 'আসসালামু আলাইকুম' কেবল একটি সম্ভাষণ নয়, বরং এটি অপর ব্যক্তির জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করা। এই অভ্যাসটি মানুষের মধ্যকার ভয় ও বিদ্বেষ দূর করে সম্প্রীতি স্থাপন করে।
তৃতীয়ত, পারিবারিক ও আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখার নির্দেশনা দেন তিনি। পরিবার হলো সমাজের ক্ষুদ্রতম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক। আত্মীয়তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হলে মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। তাই রক্তের সম্পর্ক রক্ষা করা এবং স্বজনদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকাকে তিনি সামাজিক ঐক্যের চাবিকাঠি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সবশেষে, বাহ্যিক সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি আত্মিক শক্তির উৎস হিসেবে রাতের নিভৃতে নামাজ আদায়ের কথা বলেছেন। মহানবী (সা.)-এর মতে, কেবল বৈষয়িক সমাজসেবা মানুষকে অনেক সময় অহংকারী করে তুলতে পারে। কিন্তু রাতের আঁধারে স্রষ্টার সঙ্গে একান্তে কথোপকথন এবং চোখের পানি ফেলে নিজের অহংকার বিসর্জন দেওয়ার ফলে অন্তরে যে সঞ্জীবনী শক্তি জন্মায়, তা-ই মানুষকে দিনের আলোয় নিঃস্বার্থভাবে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে।




