ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে একের পর এক মেট্রোরেল প্রকল্প নেওয়া হলেও তা অন্যান্য পরিবহন মাধ্যমের সঙ্গে সমন্বিত হচ্ছে না। বাস, রেল, সাইকেল এবং পথচারী চলাচলের সুযোগের সঙ্গে মেট্রোরেলের সেতুবন্ধন গড়ে না ওঠায় শহরের সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করেন নগর ও পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা। শুক্রবার ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত ‘মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা: আইপিডির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়।

সভায় আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান উল্লেখ করেন যে, ২০০৫ সালের স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানে (এসটিপি) একটি সমন্বিত কাঠামোর কথা বলা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনায় বাস রুটের মানোন্নয়ন, ফ্র্যাঞ্চাইজিং, বিআরটি এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামো তৈরির কথা ছিল, যার পরবর্তী ধাপে মেট্রোরেল যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। তবে ২০ বছর অতিবাহিত হলেও সেই পূর্ণাঙ্গ রূপায়ণ সম্ভব হয়নি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমানে মেট্রোরেল প্রকল্পের পেছনে অস্বাভাবিক অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। যে প্রকল্পগুলোর খরচ ৪০ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে থাকার কথা ছিল, তা এখন ১ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে মেট্রোরেল গণপরিবহনের একটি অংশ হওয়ার পরিবর্তে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল প্রকল্পে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, একটি মেট্রোরেল লাইনের অভিজ্ঞতা ভালো হওয়ায় আরও প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমেনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রতিটি প্রকল্পে এমন বিপুল অর্থ ব্যয় দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা যুক্তিযুক্ত। তাঁর মতে, কম খরচে বেশি মানুষকে সেবা দিতে হলে বাসব্যবস্থার উন্নয়ন ও পথচারীবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করা বেশি জরুরি। এছাড়া কেবল ঢাকাকে কেন্দ্র করে বড় প্রকল্প না নিয়ে দেশের অন্যান্য শহরে পরিকল্পিত উন্নয়ন করা হলে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানো সম্ভব হতো। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের অর্থ দিয়ে সারা দেশের শহরগুলোতে উন্নয়ন করা যেত বলে তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে, পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ মুনাসির মামুন সতর্ক করে বলেন, ঢাকার পরিবহন খাতের ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের সিংহভাগই এখন মেট্রোরেল কেন্দ্রিক। অথচ শহরের মোট যাতায়াতের খুব সামান্য অংশই মেট্রোরেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তাঁর দাবি, ১০টি লাইন তৈরি করলেও পুরো পরিবহন সমস্যার সমাধান হবে না। তাই নতুন মেট্রোরেলের চেয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ইন্টারসেকশন নিয়ন্ত্রণ এবং বাস নেটওয়ার্কের উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। আইপিডির গবেষক ফরহাদুর রেজাও একমত হয়ে বলেন, কোনো একক মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে আরামদায়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব; বরং বাস, মেট্রো, রেল ও হাঁটাচলার সমন্বয় প্রয়োজন।

আলোচনা সভায় জানানো হয়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর একনেক সভায় হেমায়েতপুর-ভাটারা, বিমানবন্দর-কমলাপুর এবং গাবতলী-দাসেরকান্দি—এই তিন রুটে মেট্রোরেল নির্মাণের ব্যয় বৃদ্ধি ও নতুন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মোট ব্যয় প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। এই প্রেক্ষাপটে আইপিডি বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, একসাথে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা এবং দেশীয় প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের সুযোগ বাড়ানো উচিত। এছাড়া প্রকল্পের ব্যয় যাচাইয়ে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মতামত নেওয়া এবং একটি 'ওপেন ডেটা ড্যাশবোর্ড' চালুর মাধ্যমে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রাক্কলিত ব্যয়ের দ্বিগুণ দরপত্র আসা সত্ত্বেও কেন ডিপিপি অনুমোদন করা হলো এবং বারবার ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির জন্য কারা দায়ী, তা খতিয়ে দেখে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছে আইপিডি।