বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) প্রকাশিত ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০২৬’ অনুযায়ী, নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করার বৈশ্বিক দৌড়ে এক বছরে ৫৫ ধাপ পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। ২০২৫ সালে যেখানে দেশটির অবস্থান ছিল ২৪তম, এবার ১৪৫টি দেশের তালিকায় তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৭৯তম স্থানে। সামগ্রিক স্কোরের হিসেবে বাংলাদেশ এখন ৭১.২ শতাংশ, যা গত বছরের ৭৭.৫ শতাংশের তুলনায় ৬.২ শতাংশ পয়েন্ট কম। প্রতিবেদনে এই পতনকে বিশ্বের অন্যতম বড় পতন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যদিও ২০০৬ সালের তুলনায় বর্তমান স্কোর ৮.৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাপক অবনতি হয়েছে। এই খাতের স্কোর ৭২.১ থেকে কমে ৫০.৯ শতাংশে নেমে এসেছে, ফলে অবস্থান তৃতীয় থেকে ১২তম হয়েছে। মূলত ২০২৪ সালে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর গঠিত নতুন সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ২.৪ শতাংশে নেমে আসা এর প্রধান কারণ, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। তবে মন্ত্রিসভায় নারীর প্রতিনিধিত্ব ১৯.০৫ শতাংশ এবং নারী সরকারপ্রধান থাকার দীর্ঘ ঐতিহ্যের কারণে বাংলাদেশ ২০১৯ সাল থেকে এই সূচকে পূর্ণ সমতা বজায় রেখে যৌথভাবে প্রথম স্থানে রয়েছে।

সবচেয়ে নাজুক অবস্থা অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের ক্ষেত্রে। এখানে ১৪৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২তম, যার স্কোর ৪১.৯ শতাংশ। আয়ের বৈষম্য এখানে প্রকট; পুরুষদের আনুমানিক বার্ষিক আয় ১২,৪৪০ ডলারের বিপরীতে নারীদের আয় মাত্র ৪,৬৭০ ডলার। এছাড়া উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপক পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ৬.১৬ শতাংশ। শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার ৩৮.৪১ শতাংশ, যেখানে পুরুষের হার ৭৯.৯৬ শতাংশ। এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হকের মতে, পোশাক খাতের মতো অনেক ক্ষেত্রে সুযোগ বাড়লেও জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, সামাজিক ঝুঁকি এবং শারীরিক নিরাপত্তার অভাবের কারণে নারীদের আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ কমেছে। অনেক নারী এখন গ্রামকেন্দ্রিক অনানুষ্ঠানিক বা খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত থাকায় তারা আনুষ্ঠানিক হিসেবে উঠে আসছেন না।

অন্যদিকে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। শিক্ষায় নারী-পুরুষ সমতার স্কোর ৯৬.১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দেশের জন্য সর্বোচ্চ অর্জন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পূর্ণ সমতা অর্জিত হলেও উচ্চশিক্ষায় পুরুষদের (২৬.৯৫%) তুলনায় নারীদের (২০.৭৯%) ভর্তির হার কিছুটা কম। স্বাস্থ্য ও টিকে থাকার সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৯৬ শতাংশ এবং অবস্থান ১২০তম। তবে জন্মগত অনুপাত সঠিক থাকলেও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত আয়ু এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৩৮.৯ শতাংশ নারীর বাল্যবিবাহ হয় এবং ৪৮.৮ শতাংশ নারী লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বড় পতনের পরও বাংলাদেশ প্রথম স্থান ধরে রেখেছে। এর পেছনে রয়েছে মালদ্বীপ (১১৯তম), নেপাল (১২০তম), ভুটান (১২১তম), শ্রীলঙ্কা (১২৯তম), ভারত (১৩১তম) এবং পাকিস্তান (১৪৩তম)। বৈশ্বিক পর্যায়ে আইসল্যান্ড ৯৩ শতাংশ সমতা অর্জন করে শীর্ষে এবং চাদ সবচেয়ে নিচে রয়েছে। ডব্লিউইএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান গতিতে এ অঞ্চলের লিঙ্গ বৈষম্য পুরোপুরি দূর হতে আরও ১৪৯ বছর সময় লাগতে পারে।