বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সরকারি চাকরি, বিশেষ করে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখন এতটাই প্রবল যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার থেকে কোচিং সেন্টার—সব জায়গায় একটিই চিত্র দেখা যায়। হাতে গোনা কয়েকটি পদের জন্য লাখো পরীক্ষার্থী প্রতিবছর জীবন বাজি রাখেন। দেশের শ্রমবাজার ও জনপ্রশাসনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানগুলো এই প্রবণতার পেছনের বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকার ৮ লাখ ৮৫ হাজার। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ, অর্থাৎ আট বছরে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় সংসদে গত জুলাইয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের সরকারি অফিসে মোট অনুমোদিত পদ ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন, আর শূন্য পদ ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি। এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত এই শূন্য পদের সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০। সরকার শূন্য পদ পূরণে ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।
প্রতিবছর সরকারি চাকরিতে যোগ দেয় গড়ে ২০ থেকে ৪০ হাজার জন। তবে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ লাখ পরীক্ষার্থী, আর ক্যাডার পদ থাকে মাত্র তিন থেকে পাঁচ হাজার। ফলে সাফল্যের হার প্রায় ১ শতাংশ বা তারও কম। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য বলছে, প্রতিবছর পাবলিক, প্রাইভেট ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলো থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন চার থেকে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী।
সরকারি চাকরির প্রতি এই প্রবল আকর্ষণের পেছনে মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই আসে চাকরির স্থায়িত্ব। অর্থনৈতিক মন্দা বা প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের সময়ও সরকারি চাকরি হারানোর ঝুঁকি প্রায় নেই বললেই চলে। পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো অবসরকালীন সুবিধা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দেয়। সামাজিক মর্যাদাও একটি বড় কারণ—প্রশাসনিক ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ অন্য খাতে তুলনামূলক কম। পারিবারিক ও বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সরকারি চাকরিজীবীদের সামাজিক গুরুত্ব এখনো বেশি। সার্বিকভাবে সরকারি খাতে কাজের সময়, ছুটি ও উৎসব ভাতার সুনির্দিষ্টতা থাকায় ওয়ার্ক–লাইফ ব্যালান্স অনেকের জন্য সহজ হয়। আর বহু প্রজন্ম ধরে 'সরকারি চাকরিই সাফল্যের চূড়ান্ত' এই ধারণা পারিবারিক প্রত্যাশার মাধ্যমে তরুণদের মনে গেঁথে যায়।
বিপরীতে, বেসরকারি খাতে অনিশ্চয়তা ও সীমিত সুবিধাই মূল অন্তরায়। ব্যবসায়িক মন্দা বা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে যেকোনো সময় চাকরি হারানোর শঙ্কা থাকে। দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পেনশন না থাকায় অবসর-পরবর্তী জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তা তরুণদের দূরে রাখে। উচ্চ মানসিক চাপ, পারফরম্যান্স-নির্ভরতা এবং বাড়তি কাজের যথাযথ স্বীকৃতি না মেলায় অনেকে বার্নআউটের শিকার হন। উচ্চ বেতন ও আধুনিক কর্মপরিবেশ থাকা সত্ত্বেও সমাজের বড় অংশ এখনো বেসরকারি চাকরিকে পূর্ণ স্থিতিশীল পেশা হিসেবে দেখে না।
এই প্রবণতার প্রভাবে দেশের শ্রমবাজারে দেখা দিচ্ছে নানা সংকট। উচ্চশিক্ষিত তরুণরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো বিসিএস প্রস্তুতিতে ব্যয় করে ফেলেন, ফলে বেসরকারি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ হারান। করপোরেট খাতে প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। তরুণদের প্রধান লক্ষ্য যখন চাকরির নিরাপত্তা হয়ে ওঠে, তখন উদ্যোক্তা মানসিকতা ও উদ্ভাবনের আগ্রহও কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভারসাম্যহীনতা কাটাতে বেসরকারি খাতে শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা, সুনির্দিষ্ট বেতনকাঠামো, ছাঁটাই নীতিমালা ও ন্যূনতম অবসরকালীন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে এই ধারণা পরিবর্তন জরুরি যে সরকারি চাকরিই সাফল্যের একমাত্র পথ। শিক্ষাব্যবস্থায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহারিক দক্ষতা ও উদ্যোক্তা মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কমানো, ন্যায্য মূল্যায়ন ও কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়ার মাধ্যমে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে যেমন একটি দক্ষ ও মেধাভিত্তিক প্রশাসন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও উদ্ভাবনী বেসরকারি খাত। বেসরকারি খাত যদি চাকরির স্থিতিশীলতা, অবসরকালীন নিরাপত্তা ও সামাজিক স্বীকৃতি দিতে পারে, তবেই দেশের মেধা একটিমাত্র প্রতিযোগিতার পেছনে না ছুটে বহুমুখী খাতে বিস্তৃত হবে।




